ডেস্ক নিউজ- বাংলা টুডে
মেশিন সংকটে রেডিওথেরাপির দীর্ঘ অপেক্ষা, হাসপাতাল প্রাঙ্গণে রোগী-স্বজনের মানবেতর জীবন
ঢাকার মহাখালীতে জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাতে হচ্ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ক্যান্সার রোগী ও তাঁদের স্বজনদের। হাসপাতালের ভেতরে জায়গা না থাকায় কখনো মাঠে, কখনো সিঁড়ির নিচে কিংবা হাসপাতালের দুই ভবনের মাঝের ফাঁকা জায়গায় রাত পার করছেন তাঁরা।
শনিবার রাত ১২টা থেকে ১টা পর্যন্ত হাসপাতাল ও আশপাশের এলাকা ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে। হাসপাতালের ‘বি’ ও ‘সি’ ব্লকের মাঝের জায়গা এবং পাশের বক্ষব্যাধি হাসপাতালের মাঠজুড়ে শতাধিক রোগী-স্বজনকে বিছানা পেতে, কেউবা ব্যাগ মাথার নিচে দিয়ে শুয়ে থাকতে দেখা যায়।
ফরিদপুর থেকে তৃতীয় দফা কেমোথেরাপি নিতে আসা জিন্না তালুকদারের বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। ছয় মাস ধরে খাদ্যনালীর ক্যান্সারে ভুগছেন তিনি। এর আগে দুবার কেমোথেরাপি নিয়েছেন। শনিবার তৃতীয় কেমোথেরাপি নিতে হাসপাতালে এলেও চিকিৎসা শেষ হতে সন্ধ্যা হয়ে যায়। রাতে বাড়ি ফেরার যানবাহন না থাকায় হাসপাতালের পাশের মাঠেই রাত কাটানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
জিন্না বলেন, “আমার তৃতীয় কেমোথেরাপি নেওয়া হয়েছে। কিন্তু নিতে নিতে সন্ধ্যা হয়ে গেছে, তাই আর বাড়ির দিকে যাওয়ার চিন্তা করিনি। রাতে শহরে নেমে গ্রামে যাওয়ার গাড়ি পাই না। কাল সকাল হলে বাড়ির বাসে উঠব।”
তাঁর স্ত্রী নাজমা বেগম জানান, তাঁরা শুক্রবার বিকালেই হাসপাতালে এসেছেন। এরপর থেকে হাসপাতালেই অপেক্ষা করছেন। বাইরে থাকার মতো সামর্থ্য তাঁদের নেই।
নাজমা বলেন, “এখানে সারাদিন এবং রাতে বসে থাকা যায় না; ভয় লাগে, কখন জানি বৃষ্টি শুরু হয়ে যায়। খুব সকালে উঠে টিকিট কেটে কেমোথেরাপির টাকা জমা দিতে হয়। এই চিকিৎসার খরচ অনেক কম। তাই বাধ্য হয়ে মাঠেই অপেক্ষা করি। বাইরে বা অন্য কোনো হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার সামর্থ্য আমাদের নেই।”
রাত কাটে আতঙ্কে
৫০০ শয্যার জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে প্রতিদিন দুই হাজারের বেশি মানুষ চিকিৎসাসেবা নিতে আসেন বলে জানিয়েছেন হাসপাতালের পরিচালক। বিশেষায়িত এই হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে রোগীরা আসেন। দূরবর্তী এলাকার এসব রোগী ও স্বজনদের অনেককেই চিকিৎসার জন্য একাধিক দিন ঢাকায় অবস্থান করতে হয়।
খুলনার কয়রা থেকে স্ত্রীকে নিয়ে চিকিৎসা করাতে এসেছেন মাইন উদ্দিন। তাঁর স্ত্রীর ফুসফুসে ক্যান্সার। এক বছর চিকিৎসা চালাতে গিয়ে তাঁদের সঞ্চয়ও প্রায় শেষ।
মাইন উদ্দিন বলেন, “বিভিন্ন জায়গায় দৌড়াদৌড়ির পর জুলাই মাস থেকে এখানে কেমোথেরাপি নিচ্ছি। খুব সকালে লাইন ধরে টিকিট কেটে থেরাপি নিতে হয়। কিন্তু এর চেয়ে বেশি কষ্ট হলো, এখানে রাতে থাকার বিষয়। বাইরে থেকে আসি, চিকিৎসা খরচসহ কিছু টাকা থাকে। ব্যাগ পাশে নিয়ে রাতে ঘুম আসে না। মনে হয়, টাকা হারিয়ে গেলে চিকিৎসা নেব কীভাবে?”
নড়াইল থেকে চিকিৎসা নিতে আসা লিটনের গল্পটাও একই। ক্যান্সার শনাক্ত হওয়ার পর চিকিৎসার খরচ জোগাতে চার্জার গাড়িটি বিক্রি করেছেন তিনি। এখন চিকিৎসার জন্য অল্প কিছু টাকা নিয়ে ঢাকায় আসেন। সেই টাকা সঙ্গে রেখে খোলা মাঠে ঘুমানোও তাঁর কাছে নিরাপদ মনে হয় না।
লিটন বলেন, “সঙ্গে থাকা স্ত্রী কিছুক্ষণ ঘুমায়, তখন আমি জেগে থাকি। আবার আমি ঘুমালে স্ত্রী জেগে থাকে। দুজন ভাগাভাগি করে কোনো রকম রাত কাটাই।”
বৃষ্টির ভয়ও তাড়া করে এসব রোগী-স্বজনকে। তাঁর ভাষ্য, বৃষ্টি শুরু হলে মাঠের মানুষজন সিঁড়ির নিচে আশ্রয় নেন। তখন সেখানে জায়গা পাওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
রেডিওথেরাপির সিরিয়াল পেতেই দুই-তিন মাস
শুধু থাকার সংকট নয়, ক্যান্সার রোগীদের আরেক বড় ভোগান্তি রেডিওথেরাপির দীর্ঘ অপেক্ষা। জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে রেডিওথেরাপির জন্য ছয়টি মেশিন থাকলেও বর্তমানে সচল আছে মাত্র দুটি।
ফলে রেডিওথেরাপির সিরিয়াল পেতে দুই থেকে তিন মাস পর্যন্ত সময় লাগছে বলে জানিয়েছেন রোগী ও স্বজনেরা।
আজিজুল হক তাঁর বড় ভাইকে রেডিওথেরাপি দিতে হাসপাতালে এসেছেন। চিকিৎসকের পরামর্শ পাওয়ার পর মে মাস থেকে সিরিয়ালের জন্য ঘুরেছেন। অবশেষে সিরিয়াল পাওয়ার পর নির্ধারিত সময়ের আগে হাসপাতালে চলে এসেছেন তিনি।
আজিজুল বলেন, “সিরিয়াল যেন আগে নিতে পারি, সেজন্য শনিবার বিকালেই চলে আসছি ভাইকে নিয়ে। রাতে কষ্ট করে বাইরে বসে সময় কাটাচ্ছি। সকাল হলে টিকিট কেটে থেরাপি নেওয়া হবে।”
অপেক্ষমাণ সাত হাজারের বেশি রোগী
রেডিওথেরাপির মেশিন সংকটের কথা স্বীকার করেছেন জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক মোস্তফা আজিজ সুমন।
তিনি বলেন, “মেশিন সংকট থাকার ফলে আমরা রোগীদের চাহিদামতো সেবা দিতে পারছি না। বর্তমানে দুটো সচল মেশিন দিয়ে জরুরি রোগীদের সেবা দিচ্ছি। এই মুহূর্তে অপেক্ষমাণ সাত হাজারের বেশি রোগী রয়েছে। তাদের জন্য সিরিয়াল দেওয়া খুবই কঠিন হচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই রোগীরা অন্তত চার থেকে ছয় সপ্তাহ পর সিরিয়াল পাচ্ছেন।”
হাসপাতাল প্রাঙ্গণে রোগী ও স্বজনদের রাত কাটানোর বিষয়ে পরিচালক বলেন, রোগীর স্বজনদের জন্য হাসপাতালের আলাদা আবাসনের ব্যবস্থা নেই। একজন রোগীর সঙ্গে একাধিক স্বজন আসায় সবার থাকার ব্যবস্থা করাও হাসপাতালের পক্ষে সম্ভব নয়।
তবে পরিস্থিতি কিছুটা উন্নত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, সকালের টিকিট কাউন্টারগুলো মূল সড়কের পাশে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। সেখানে নতুন শেড তৈরি করে টিকিট কাউন্টার চালু করা হবে। এতে অন্তত কিছু রোগী ও স্বজন রাতে সেখানে অবস্থানের সুযোগ পাবেন।
চিকিৎসার জন্য দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে রাজধানীতে আসা ক্যান্সার রোগীদের কাছে হাসপাতালের সেবা যেমন আশার আলো, তেমনি চিকিৎসার অপেক্ষায় খোলা মাঠে রাত কাটানো তাঁদের জন্য হয়ে উঠছে আরেক কঠিন পরীক্ষা। সামর্থ্য না থাকায় থাকার জায়গা ভাড়া নিতে না পারা এসব রোগী-স্বজনের দুর্ভোগ কমাতে হাসপাতালসংলগ্ন স্বল্পমূল্যের আবাসন বা বিশ্রামকেন্দ্রের ব্যবস্থা এখন সময়ের দাবি।





