বিশেষ প্রতিনিধি- সুবীর
চট্টগ্রামঃ চট্টগ্রাম মহানগর ও জেলায় আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে সশস্ত্র সন্ত্রাস। রাজনৈতিক আধিপত্য, মাদক কারবার, চাঁদাবাজি ও আন্ডারওয়ার্ল্ডের নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে একের পর এক সংঘটিত হচ্ছে হত্যাকাণ্ড। প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে প্রতিপক্ষকে হত্যা করতেও দ্বিধা করছে না অপরাধীরা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গত বছরের আগস্টে লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারে কিছুটা সফল হলেও অবৈধ অস্ত্রের নতুন চালান ঠেকাতে কার্যকর অগ্রগতি নেই। ফলে অস্ত্রের অবাধ প্রবাহে চট্টগ্রামের অপরাধ পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, রাউজানে গত বছরের ৫ আগস্টের পর থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ২৫টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে প্রায় অর্ধেকই রাজনৈতিক বিরোধের জেরে সংঘটিত। সর্বশেষ বৃহস্পতিবার নগরীর মুরাদপুর এলাকায় ইয়াবা সেবনের আসরে প্রতিপক্ষের ছোড়া গুলিতে (মিস ফায়ারে) অপরাধীচক্রের এক সদস্য নিহত হন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, সাম্প্রতিক অধিকাংশ হত্যাকাণ্ডেই অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের প্রমাণ মিলেছে।
লুট হয়েছিল ৯৪৮টি অস্ত্র
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র আন্দোলনের সময় চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) ১৬টি থানার মধ্যে ১২টি হামলার শিকার হয়। এর মধ্যে কোতোয়ালি, সদরঘাট, ডবলমুরিং, পাহাড়তলী, আকবর শাহ, ইপিজেড, পতেঙ্গা ও হালিশহর থানা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কয়েকটি থানা প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল।
এসব থানা থেকে মোট ৯৪৮টি অস্ত্র ও বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ লুট হয়। লুট হওয়া অস্ত্রের মধ্যে ছিল ১০৫টি ৭.৬২ মিমি চায়না রাইফেল, ৬২টি এসএমজি-৫৬, একটি এলএমজি, ৪৫টি পিস্তল-৫৪, ১১০টি ৯ মিলিমিটার পিস্তল, তিনটি এসএমজি, চারটি ১২ বোর শটগান, ২০৩টি ৩৮ মিলিমিটার গ্যাস গান, পাঁচটি টিয়ার গ্যাস লঞ্চারসহ বিভিন্ন ধরনের আগ্নেয়াস্ত্র।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত লুট হওয়া ৭৯৪টি অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। তবে ১৫৪টি অস্ত্র এখনো উদ্ধার হয়নি। তদন্তসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এসব অস্ত্রের একটি অংশ ইতোমধ্যে অপরাধী চক্রের হাতে চলে গেছে।
শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নেটওয়ার্ক এখনো অক্ষত
গোয়েন্দা সূত্র বলছে, শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খান ওরফে বড় সাজ্জাদ বিদেশে অবস্থান করলেও তার অপরাধ নেটওয়ার্ক পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি। ছোট সাজ্জাদ কারাগারে থাকলেও সহযোগীরা এখনো সক্রিয়। বর্তমানে রায়হান আলম, মোবারকসহ কয়েকজন দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী নগরীর বিভিন্ন এলাকায় অস্ত্রধারী গ্রুপ পরিচালনা করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
পাহাড়তলী ও বায়েজিদ বোস্তামী এলাকায় সাবেক কমিশনার জসিম উদ্দিনের অনুসারী কয়েকটি সশস্ত্র গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে। অন্যদিকে চান্দগাঁও ও আকবর শাহ এলাকায় একসময় আধিপত্য বিস্তারকারী শীর্ষ সন্ত্রাসী ঢাকাইয়া আকবরকে গত ২৫ মে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ওই হত্যাকাণ্ডে নেতৃত্ব দেন রায়হান আলম।
সাত মাসেও ধরা পড়েনি রায়হান
সরোয়ার হোসেন বাবলা হত্যা মামলার সাত মাস পেরিয়ে গেলেও অভিযুক্ত রায়হান আলম এখনো অধরা। তার বিরুদ্ধে সাতটি হত্যাসহ অন্তত ১৫টি মামলা রয়েছে।
গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, ৫ আগস্টের পর চট্টগ্রাম মহানগর ও জেলার বেশ কয়েকটি টার্গেট কিলিংয়ে রায়হানের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। রাউজান, ফটিকছড়ি ও রাঙ্গুনিয়ার দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় তার একাধিক গোপন আস্তানা রয়েছে বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারণা।
সীমান্ত দিয়ে অব্যাহত অস্ত্রের প্রবেশ
অপরাধ দমন সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের পাশাপাশি নতুন অস্ত্রের প্রবেশ বন্ধ করা না গেলে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব নয়। বর্তমানে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি, থানচি, তমব্রু ও নেফিউপাড়া এবং কক্সবাজারের টেকনাফ, উখিয়া ও কুতুপালং সীমান্ত দিয়ে নিয়মিত অস্ত্র পাচার হচ্ছে।
এ ছাড়া নাফ নদী ব্যবহার করে হোয়াইক্যংয়ের উনচিপ্রাং ও উলুবনিয়া, টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের লেদা, দমদমিয়া, জাদিমুরা, নয়াপাড়া এবং সদর ইউনিয়নের বরইতলী খাল দিয়েও অস্ত্র দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করছে।
গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, এসব রুট ব্যবহার করে অস্ত্র পাচারে রোহিঙ্গাদের একটি অংশ মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে। মিয়ানমার সীমান্তে সক্রিয় অন্তত ১০টি চক্র অস্ত্র পাচারে জড়িত। এর মধ্যে রয়েছে আরাকান আর্মি, আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (আরসা), রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন (আরএসও) এবং আরও কয়েকটি সশস্ত্র গোষ্ঠী। এসব অস্ত্রের বড় অংশ শেষ পর্যন্ত চট্টগ্রামের অপরাধী চক্রগুলোর হাতে পৌঁছে যাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা।
উদ্বেগ বাড়ছে, জবাব নেই পুলিশের
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, অবৈধ অস্ত্রের সহজলভ্যতা, পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসীদের সক্রিয় নেটওয়ার্ক এবং সীমান্ত দিয়ে অস্ত্র পাচার বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় চট্টগ্রামে সংঘবদ্ধ অপরাধ নতুন করে বিস্তার লাভ করছে। এতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সাধারণ মানুষের উদ্বেগও বাড়ছে।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (গণসংযোগ) মো. রাসেলের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।






