এম এইচ বাচ্ছুঃ
চট্টগ্রাম মহানগরীর চান্দগাঁও- পাঁচলাইশ ও বায়েজিদে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ক্যাডার, চিহ্নিত অস্ত্রধারী চাঁদাবাজ, মাদক ব্যবসায়ী ও সন্ত্রাসীরা আবারো বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। তাদের সক্রিয় সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে সাধারণ ব্যবসায়ী এবং নির্মাণাধীন ভবন মালিকরা যেমন অসহায় তেমনি সাধারণ এলাকাবাসীরাও আতঙ্কে দিন কাটায়।
অনুসন্ধানে জানা যায়, চান্দগাঁও-পাঁচলাইশ থানা এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে আলোচিত তাসিন হত্যা মামলার অন্যতম আসামি ছোট সাজ্জাদের অনুসারী ইলিয়াস হোসেন অপু, অপুর ভাই ফয়সাল এবং এমরান। তাদের দলে রয়েছে পুলিশের কথিত সোর্স হিসেবে পরিচিত জয়নাল আবেদীন সোহেল ও আজগর আলী মিন্টু। কতিপয় পুলিশ সদস্যের সাথে সুসম্পর্ক থাকার সুবাদে তারা এলাকায় মাদক ব্যবসা, জুয়ার আসর পরিচালনা, দখলবাজিসহ নানা অপকর্মে জড়িত। আওয়ামীলীগ সরকারের আমলে পুলিশে নিয়োগপ্রাপ্ত ছাত্রলীগের ক্যাডারদের মাধ্যমে বিভিন্ন নিরীহ মানুষকে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেয়। তারা বর্তমানে আওয়ামী লীগের খোলস পাল্টিয়ে বিএনপির নাম ভাঙ্গিয়ে এসব অপকর্ম করেও পার পেয়ে যাচ্ছে। নগরীর এই ৩টি থানা সীমানা এলাকাভিত্তিক নতুন নতুন কিশোর গ্যাং গড়ে তুলায় অপরাধ কর্মকান্ড আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে।
জানা যায়, পাচঁলাইশ থানাধীন হাদু মাঝি পাড়া, নাজির পাড়া, খতিবের হাট, রাজগঞ্জ, জাঙ্গাল পাড়া, হিন্দু পাড়া, চান্দগাঁও থানাধীন ফরিদের পাড়া ও খন্দকার পাড়া, সমশের পাড়া, অদুর পাড়া, ডালিপাড়া,চাঁনমিয়া আবাসিক, বায়েজিদ থানাধীন হাজীপাড়া, চালিতাতলী, অনন্যা আবাসিক, তামান্না আবাসিক, খন্দকার পাড়াসহ বিভিন্ন মহল্লায় নতুন করেই ইয়াবা, গাঁজা ফেন্সিডিল ব্যবসা, অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে চুরি, জায়গা-জমির দখল বেদখল বেড়ে গেছে।
একটি সুত্রে জানা যায়, এসব অপরাধীরা একজন গোয়েন্দা সংস্থার (ডিবি) সদস্য পরিচয় দানকারীর শেল্টারে অপকর্ম করে। উক্ত ডিবি সদস্য অভিযানে উদ্ধারকৃত মাদকের একটি অংশ উল্লেখিত সন্ত্রাসীদের মাধ্যমে বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করে। সন্ত্রাসীদের বেশ কয়েকজন বিভিন্ন মামলায় কারাগারে গেলেও তারা জামিনে বেরিয়ে এসে হত্যা, চুরি, ছিনতাইয়ে জড়িয়ে পড়ে।
পাচঁলাইশ ৭নং পশ্চিম ষোলশহর হাদু মাঝি পাড়ার সাবের মাষ্টার বাড়ির মৃত ইউনুসের ছেলে অপুর অপরাধ সাম্রাজ্যে নতুন নতুন কিশোর অপরাধীরা যোগ দেওয়ায় তার দলের অপরাধীরা আরো বেপরোয়া হয়ে গেছে । আইনশৃঙ্খলা বাহিনী থেকে বাঁচার জন্য প্রতিনিয়ত ঠিকানা বদলাতে থাকে আজগর আলী মিন্টু, হাদু মাঝি পাড়ার নেছার বাপের বাড়ির ফার্ণিচার নাছের এর ছেলে সোহেল, করি হোসেনের ছেলে আনোয়ার, ছাবের মাষ্টারের বাড়ির জহির আহম্মদ এর ছেলে এমরান। তারা বহিরাগত স্বশস্ত্র সন্ত্রাসীদের এলাকায় এনে ২০-৩০ জনের দল নিয়ে মহড়া দিয়ে বিভিন্ন ভবন নির্মাণকারী ও ব্যবসায়ীদেরকে জিম্মি করে প্রকাশ্যে চাঁদা দাবী করে। তাদের নির্যাতনে এলাকার মানুষের ঘুম হারাম হয়ে গেছে। আওয়ামী লীগের আমলে ইলিয়াস হোসেন অপু, এমরান, আজগর আলী মিন্টু, পুলিশের সোর্স সোহেল বিএনপির নেতা-কর্মীদেরকে বিভিন্ন মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করেন। আলোচিত আফতাব হোসেন তাহসিন হত্যা মামলার বাদী মুসাকে মামলা উঠানোর জন্য প্রতিনিয়ত হুমকি দিয়ে যাচ্ছে ইলিয়াস হোসেন অপু ও এমরান। এদের অধিকাংশ সদস্যই বৈষম্য বিরোধী ছাত্র জনতার উপর হামলা মামলার আসামি।
হাদু মাঝি পাড়ার আলম বিল্ডিংয়ে বসবাসকারী ব্যবসায়ী আসহাব উদ্দিন এর কাছ থেকে চাঁদা দাবি করে এই চক্রের সদস্যরা। তিনি চাঁদা দিতে অস্বীকার করায় তাকে ধরে ইয়াবা দিয়ে চালান করে দেবে বলে হুমকি দেয়। ইলিয়াস হোসেন অপুর দাবীকৃত এক লক্ষ টাকা চাঁদা না দেওয়ায় তার মালামাল ও টাকা পয়সা লুটপাট করে নিয়ে যায়। এই ঘটনায় থানায় অভিযোগ করলেও পুলিশ কোন ব্যবস্থা নেয়নি। গত ২৭ শে এপ্রিল মাঝির দোকান ক্লাবের সামনে শহিদ এর চায়ের দোকান থেকে দাবীকৃত চাঁদা না পেয়ে অত্র দোকান লুটপাট করে। এছাড়া প্রবাসী ইমাম হোসেনের ছেলের বাড়ি নির্মাণকালে ১০ লক্ষ টাকা চাঁদা দাবি করে না পেয়ে রাতের বেলায় ১৭ই মার্চ নির্মাণ কাজের জন্য রাখা ৫ লক্ষ টাকার লোহার রড প্রকাশ্যে ছিনতাই করে নিয়ে যায়।
২০২৪ সালে হাদুমাঝি পাড়ার নাছির বিল্ডিং সংলগ্ন প্রবাসী রাজু আহমেদের নির্মাণাধীন ভবন থেকে ৫ লক্ষ টাকা চাঁদা দাবী করে সোহেলের নেতৃত্বে একটি চাঁদাবাজ চক্র। রাজু আহমেদ উক্ত ঘটনায় পাঁচলাইশ থানায় অভিযোগ দায়ের করলে তাকে এবং তার স্ত্রীকে পিটিয়ে মারাত্মক জখম করে। পরে থানায় মামলা দায়ের হলেও ১ দিনের জন্য জেলে যেতে হয়নি তাদের।
চন্দ্রিমা আবাসিকের তৌফিক চৌধুরীর নির্মাণাধীন ভবন থেকে ৭ লক্ষ টাকা চাঁদা দাবি করে না পেয়ে তাকে অপহরণের হুমকি দেয়। রাজগঞ্জে একটি নির্মাণাধীন বিল্ডিং এর মালিক আনোয়ার হোসেন জানান গত ১৪ ই জানুয়ারি তার কাছে চাঁদা দাবি করে না পেয়ে তার বিল্ডিং এর গেটে ইলিয়াস হোসেন অপু এবং এমরান গুলি করে পালিয়ে যায়।
গত ১লা জুন রাত ৮ টার দিকে ইলিয়াস হোসেন অপু, ফয়সাল এমরানসহ বেশ কয়েকজন সন্ত্রাসী সাংবাদিক ও ব্যবসায়ী নুরুল কবিরের গতিরোধ করে ৫ লক্ষ টাকা চাঁদা দাবি করেন। চাঁদা না দেওয়াতে অপহরণ ও মারধর করেন এবং ব্যবসার ২ লক্ষ ৭ হাজার টাকা ও মোবাইল ছিনিয়ে নেয়। পরবর্তীতে ৯৯৯ এ ফোন করলে পুলিশ আসলে সন্ত্রাসীরা পালিয়ে যায়। নুরুল কবির থানায় অভিযোগ করলে পরের দিন আবারো তার গতিরোধ করে থানায় অভিযোগ করায় ক্ষিপ্ত হয়ে কবিরকে কিরিচ দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর জখম করে এবং তার স্ত্রীকে লোহার রড দিয়ে পিটিয়ে মারাত্মক জখম করে। উক্ত ঘটনায় পাঁচলাইশ থানায় মামলা দায়ের হয়, কিন্তু আসামিরা নাকের ডগায় ঘুরে বেড়ালেও পুলিশ অজানা কারণে গ্রেফতার করছে না।
ভুক্তভোগী নুরুল কবির বলেন, ইলিয়াস হোসেন অপু ২০২৪ সালে তার বাসার দরজা ভেঙ্গে নগদ ১৪ লক্ষ টাকা চুরি করে। উক্ত ঘটনায় মামলা দায়ের করলে পুলিশ অজানা কারণে মামলার সত্যতা পাওয়া যায়নি মর্মে চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রদান করেন। এই বছরের মার্চ মাসে তার দোকানের শাটার ভেঙ্গে সমস্ত মালামাল নিয়ে যায়। তার উপর হামলার পর মামলা দায়ের করায় আরো ক্ষিপ্ত হয়ে মুরগী পরিবহনে ব্যবহৃত ব্যাটারী চালিত ভ্যান ছিনতাই করে নিয়ে যায়। অপু তাকে প্রতিনিয়ত জানে মেরে ফেলার হুমকি দিচ্ছে। তিনি ও তার পরিবার জীবনের চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতেছেন।
এলাকায় তারা সকলকে দম্ভ করে বলে বেড়ায় তারা ২/৩ টি হত্যা মামলার আসামি হয়েও ইয়াবা বিক্রি করে প্রসাশনকে সাপ্তাহিক-মাসিক মাসোহরা দিয়ে থাকে। তাদের বিরুদ্ধে কোনো থানায় মামলা নিবে না। আর থানা পুলিশ চাপে পড়ে গ্রেফতার করলেও জামাই আদরে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়।
অত্র এলাকার কয়েকজন নাইট গার্ড বলেন, অপু এবং তার দলবল প্রতিদিন অস্ত্রের মুখে ছিনতাই ও ডাকাতি করে । রাস্তায় থাকা রিকশা এবং ব্যাটারী রিকশাও ডাকাতি করে নিয়ে যায়। এসবের দিকে তাকালে তারা হুমকি দিয়ে বলে, চোখ আছে দেখে থাকবি, কান আছে শুনে থাকবি কাউকে কিছু বললে লাশ রাস্তায় পড়ে থাকবে।
এই বিষয়ে বিএনপি নেতা আর ইউ চৌধুরী শাহিন, মনজুর আলম ও এসকান্দর মির্জা যৌথ বিবৃতিতে বলেন উক্ত সন্ত্রাসীরা আমাদের দলের কেউ নয়। তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য স্থানীয় থানাকে অবহিত করা হয়েছে।
এই ব্যাপারে জানতে চাইলে পাঁচলাইশ থানার অফিসার ইনচার্জ বলেন, এই অপরাধীদেরকে গ্রেফতার করতে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। পুলিশ তাদেরকে দ্রুত গ্রেফতারে সক্ষম হবে।





