কক্সবাজারে অবৈধ রিসোর্ট উচ্ছেদ শুরু, গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো চারতলা ভবন

ছয় কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ভবন ভাঙার দাবি মালিকের, মেরিন ড্রাইভে অভিযান চলবে

বিশেষ প্রতিনিধি- বাংলা টুডে

কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভ-সংলগ্ন এলাকায় অবৈধভাবে গড়ে ওঠা হোটেল-রিসোর্ট উচ্ছেদে যৌথ অভিযান শুরু হয়েছে। অভিযানের প্রথম দিনেই উখিয়ার ইনানী সৈকত এলাকায় গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে চারতলা একটি রিসোর্ট ভবন। ভবনটি নির্মাণে প্রায় ছয় কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে বলে দাবি করেছেন মালিক শহিদুল হক।

আজ সোমবার দুপুরে কক্সবাজার শহর থেকে প্রায় ২৬ কিলোমিটার দূরে ইনানী সৈকতে এ অভিযান চালানো হয়। কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কউক) নেতৃত্বে অভিযানে জেলা প্রশাসন, পুলিশ, এসআরবি, ফায়ার সার্ভিস, পরিবেশ অধিদপ্তর ও আনসার বাহিনীর সদস্যরা অংশ নেন।

কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের ইনানীতে নৌবাহিনীর জেটির পূর্ব পাশে তারকা হোটেল রয়েল টিউলিপ। এর উত্তর পাশে রয়েছে বে ওয়াচ হোটেল। এ দুই হোটেলের মাঝখানে অবস্থিত চারতলা রিসোর্ট ভবনটি।

সোমবার বেলা ১১টার দিকে ভবনটির সামনে খননযন্ত্র (এক্সক্যাভেটর) নিয়ে আসা হয়। পরে ভবনের নিচতলা ও দুই পাশে থাকা ১০ থেকে ১২টি দোকানঘর ভেঙে ফেলা হয়। এরপর ভবনের কাচ ভাঙা হয় এবং মূল ভবনের পিলার গুঁড়িয়ে দেওয়ার কাজ শুরু হয়। অভিযান দেখতে আশপাশের এলাকার লোকজনও সেখানে ভিড় করেন।

অভিযান পরিচালনাকারী কউকের কর্মকর্তারা জানান, অবৈধভাবে নির্মিত ভবনটি নিজ উদ্যোগে ভেঙে ফেলতে মালিকপক্ষকে চারবার নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু নোটিশের পরও ভবনটি অপসারণে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এ কারণে যৌথভাবে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হচ্ছে।

তবে ভবনমালিক শহিদুল হক দাবি করেন, ২০১৪ সালে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে অনুমতি নিয়ে ভবনটির নির্মাণকাজ শুরু করেন তিনি। সম্প্রতি নিচতলায় কয়েকটি দোকান, দ্বিতীয় তলায় রেস্তোরাঁ এবং তৃতীয় ও চতুর্থ তলায় পর্যটকদের থাকার জন্য কক্ষ তৈরি করা হয়েছিল। কিছুদিনের মধ্যেই রিসোর্টটি উদ্বোধনের পরিকল্পনা ছিল তাঁর।

শহিদুল হক বলেন, ‘চারটি নোটিশেরই জবাব দিয়েছি। ভবন নির্মাণের বিপরীতে কাগজপত্রও আছে, কিন্তু কেউ তা আমলে নিচ্ছে না।’ তাঁর দাবি, প্রায় ছয় কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ভবনটি উদ্বোধনের আগেই ভেঙে দেওয়া হলো।

মেরিন ড্রাইভে শতাধিক রিসোর্ট-কটেজ অবৈধ

গত ১৭ অক্টোবর সকালে মেরিন ড্রাইভের পাটুয়ারটেক সৈকতে তিনতলা টুপটাপ রিসোর্টে আগুন লেগে ১০ পর্যটকের মৃত্যু হয়। এ ঘটনার পর মেরিন ড্রাইভের দুই পাশে কউকের অনুমোদন ছাড়া হোটেল-রিসোর্টসহ বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। এরপর অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে যৌথ অভিযান শুরুর সিদ্ধান্ত নেয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

কউক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মুহাম্মদ জসিম উদ্দিন বলেন, ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ মেরিন ড্রাইভের দুই পাশে প্রায় আড়াই হাজার স্থাপনা গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে প্রায় ২০০টির বেশি হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজ রয়েছে। এসব স্থাপনার বেশির ভাগেরই বৈধ অনুমোদন নেই। অনেক স্থাপনা কাঠ ও বাঁশ দিয়ে তৈরি।

তিনি বলেন, মেরিন ড্রাইভের দুই পাশে অবকাঠামো নির্মাণ নিষিদ্ধ হলেও সেখানে বিভিন্ন স্থাপনা গড়ে উঠেছে। কউক প্রতিষ্ঠার পর থেকে কক্সবাজার পৌরসভাসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় ভবন নির্মাণের জন্য প্রায় ১ হাজার ৭০০টি নকশা অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। অবৈধ স্থাপনা সরিয়ে নিতে সংশ্লিষ্টদের নোটিশ দেওয়া হয়েছে। এরপরও স্থাপনা অপসারণ না করায় যৌথ অভিযান চালানো হচ্ছে। মেরিন ড্রাইভে কোনো অবৈধ স্থাপনা রাখতে দেওয়া হবে না।

সৈকতের ৫০০ গজের মধ্যে স্থাপনা নির্মাণ নিষিদ্ধ

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, মেরিন ড্রাইভের দুই পাশে অনেক অবৈধ স্থাপনা গড়ে উঠেছে। প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় (ইসিএ) সমুদ্রসৈকতের ৫০০ গজের মধ্যে এবং শহর এলাকায় পৌরসভার ৩০০ গজের মধ্যে রিসোর্ট-কটেজসহ বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ নিষিদ্ধ। এ কারণে মেরিন ড্রাইভের শতাধিক রিসোর্ট, কটেজ ও রেস্তোরাঁ কউকের অনুমোদন পায়নি।

জেলা প্রশাসক বলেন, কউকের অনুমোদন না থাকলে ফায়ার সার্ভিস ও পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের অনুমোদন পাওয়ার ক্ষেত্রেও সমস্যা হয়। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অবৈধ রিসোর্ট-কটেজসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে গিয়ে কাগজপত্র যাচাই করা হচ্ছে। পাশাপাশি অবৈধভাবে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে যৌথ উচ্ছেদ অভিযান চলছে।

যেসব প্রতিষ্ঠানের কিছু কাগজপত্র রয়েছে, কিন্তু অনুমোদনপ্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়নি, সেগুলোর বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক বলেন, ব্যবসায়ীরা অনুমোদনপ্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করতে ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালুর প্রস্তাব দিয়েছেন। তাঁদের প্রস্তাব গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা হচ্ছে।

২৬ রিসোর্ট ও ১০ রেস্তোরাঁকে নোটিশ

পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজারের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা বলেন, মেরিন ড্রাইভ-সংলগ্ন এলাকায় পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়া রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁ পরিচালনা করায় সম্প্রতি ২৬টি রিসোর্ট ও ১০টি রেস্তোরাঁকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। নোটিশের জবাব না দেওয়ায় ১৪টি রিসোর্টকে জরিমানা করা হয়েছে এবং দুটি রিসোর্টের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।

তিনি জানান, ১৯৯৯ সালে মেরিন ড্রাইভ-সংলগ্ন সৈকত এলাকাকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) ঘোষণা করে সরকার।

কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভ রিসোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুকিম খান বলেন, মেরিন ড্রাইভে অনেক রিসোর্ট-কটেজ অনুমোদন ছাড়াই গড়ে উঠেছে। তাঁরাও চান, অবৈধ হোটেল-রিসোর্টগুলোকে আইনের আওতায় আনা হোক। টুপটাপ রিসোর্টে আগুনে পর্যটকদের প্রাণহানির ঘটনায় কক্সবাজারের পর্যটনশিল্পের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

অন্যদিকে কক্সবাজার হোটেল গেস্টহাউস মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার বলেন, তাঁদের সমিতির সদস্যসংখ্যা ১৮৭। সমিতির তালিকাভুক্ত অধিকাংশ হোটেল ও গেস্টহাউসের অনুমোদন রয়েছে। তবে সমিতির বাইরের প্রতিষ্ঠানগুলোর কাগজপত্রের অবস্থা সম্পর্কে তাঁর জানা নেই।

শেয়ার করুন :

সর্বশেষ সংবাদ

অপরাধ
Md Moffassir

নিকলীতে ঘর থেকে তুলে ১০ বছরের শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগ, গ্রেপ্তার ১

ডেস্ক রিপোর্ট- বাংলা টুডে মায়ের মামলায় অভিযুক্তকে কারাগারে পাঠিয়েছেন আদালত কিশোরগঞ্জের হাওর–অধ্যুষিত নিকলীতে ঘর

Read More »