বিশেষ প্রতিনিধি- বাংলা টুডে
৫ মার্চের সেই অবরুদ্ধের ঘটনার জের, বেতন কমল আরও ৫ কর্মকর্তার
পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে (বিএসইসি) ঘটেছে নজিরবিহীন প্রশাসনিক পদক্ষেপ। সংস্থাটির ১৭ কর্মকর্তাকে একসঙ্গে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। একই ঘটনায় বিভিন্ন পর্যায়ের আরও পাঁচ কর্মকর্তার বেতন নামিয়ে আনা হয়েছে সর্বনিম্ন স্তরে।
বিএসইসি প্রতিষ্ঠার পর একসঙ্গে এত কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর ঘটনা এটাই প্রথম বলে জানা গেছে।
গত বছরের ৫ মার্চ তৎকালীন বিএসইসি চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ ও কয়েকজন কমিশনারকে কয়েক ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রাখার ঘটনার জেরেই সরকারের নির্দেশনায় এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। মোট ২২ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। মঙ্গলবার অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করে বিএসইসি।
বিএসইসি সূত্রে জানা গেছে, সরকারের পক্ষ থেকে মোট ২৩ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে ২২ জনের বিরুদ্ধে গতকাল ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। অপর একজন এরই মধ্যে অন্য একটি অভিযোগে চাকরি থেকে বরখাস্ত হওয়ায় তাঁর বিরুদ্ধে নতুন করে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
যাঁদের বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে, তাঁদের কয়েকজন জানিয়েছেন, মঙ্গলবারই বিএসইসির পক্ষ থেকে সিদ্ধান্তের কথা তাঁদের জানানো হয়। তবে আনুষ্ঠানিক আদেশের চিঠি তাঁরা হাতে পান বুধবার। অনেকে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিএসইসি কার্যালয়ে গিয়ে চিঠি গ্রহণ করেন।
যে ঘটনার পর শুরু হয় তদন্ত
গত বছরের ৫ মার্চ বিএসইসিতে ঘটে নজিরবিহীন এক পরিস্থিতি। সংস্থাটির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাংশ তৎকালীন চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের চার ঘণ্টার বেশি সময় অবরুদ্ধ করে রাখেন। পরে সেনাবাহিনী গিয়ে তাঁদের উদ্ধার করে।
ঘটনার সূত্রপাত হয় বিএসইসির তৎকালীন নির্বাহী পরিচালক সাইফুর রহমানকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর প্রতিবাদকে কেন্দ্র করে। পরে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তৎকালীন কমিশনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ তুলে ধরেন এবং কর্মবিরতিও পালন করেন। কয়েক দিন ধরে বিএসইসিতে তৈরি হয় অস্থির পরিস্থিতি।
ওই ঘটনায় রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানায় মামলা করা হয়। গত বছরের ৬ মার্চ করা মামলায় ১৬ কর্মকর্তাকে আসামি করা হয়েছিল। তৎকালীন বিএসইসি চেয়ারম্যানের নিরাপত্তায় নিয়োজিত গানম্যান আশিকুর রহমান বাদী হয়ে মামলাটি করেন।
মামলার পাশাপাশি বিভাগীয় তদন্ত
ফৌজদারি মামলার পাশাপাশি সরকারি বিধি অনুযায়ী শুরু হয় প্রশাসনিক তদন্ত ও বিভাগীয় কার্যক্রম। অর্থ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে তদন্তের পাশাপাশি অভিযুক্ত কর্মকর্তা এবং অভিযোগকারীদের সাক্ষ্যও নেওয়া হয়।
দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে সরকারের পক্ষ থেকে বিএসইসিকে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়। সেই নির্দেশনার ভিত্তিতেই এবার ২২ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিল পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
মামলার অভিযোগে কী বলা হয়েছিল
মামলার অভিযোগে বলা হয়, তৎকালীন চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদের সভাপতিত্বে কমিশনের নির্ধারিত সভাকক্ষে সভা চলছিল। সেখানে কমিশনার মো. মহসিন চৌধুরী, মো. আলী আকবর ও ফারজানা লালারুখও উপস্থিত ছিলেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, অভিযুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জোরপূর্বক সভাকক্ষে প্রবেশ করে চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের অবরুদ্ধ করেন। পরে পূর্বপরিকল্পিতভাবে কমিশনের মূল ফটকে তালা দেওয়া হয়। একই সঙ্গে সিসিটিভি ক্যামেরা, ওয়াই-ফাই ও লিফট বন্ধ করে দেওয়া এবং বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার অভিযোগও আনা হয়।
মামলার ভাষ্য অনুযায়ী, এসব কর্মকাণ্ডের ফলে বিএসইসি কার্যালয়ে ভীতিকর ও অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
এক ঘটনায় ২২ জনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা
একদিকে ফৌজদারি মামলা, অন্যদিকে বিভাগীয় তদন্ত—দুই প্রক্রিয়া শেষে এবার এল প্রশাসনিক শাস্তি। এর মধ্য দিয়ে গত বছরের ৫ মার্চের সেই ঘটনা নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
বিএসইসির ইতিহাসে একসঙ্গে ১৭ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর ঘটনা সংস্থাটির ভেতরে বড় ধরনের প্রশাসনিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি আরও পাঁচ কর্মকর্তার বেতন সর্বনিম্ন স্তরে নামিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তও নজিরবিহীন বলে সংশ্লিষ্টদের অনেকে মনে করছেন।






