টানা অতি ভারী বৃষ্টিতে ঝুঁকিতে পাহাড়ি জনপদ ও রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির, আরও ধসের আশঙ্কা প্রশাসনের
বিশেষ প্রতিনিধি- সুবীর
কক্সবাজারঃ টানা অতি ভারী বর্ষণে কক্সবাজারে ভয়াবহ পাহাড়ধসের ঘটনায় এক রাতেই অন্তত নয়জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে আটজন রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরের বাসিন্দা এবং একজন স্থানীয় বাসিন্দা। পৃথক এসব দুর্ঘটনায় আরও কয়েকজন আহত হয়েছেন। উদ্ধার অভিযানে ফায়ার সার্ভিস, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) ও স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবীরা অংশ নেন।
সোমবার (৭ জুলাই) দিবাগত রাত ১টা থেকে ভোর ৪টার মধ্যে কক্সবাজার সদর উপজেলার ছাত্তারের ঘোনা এবং উখিয়ার বালুখালী, কুতুপালং ও জামতলী রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে পৃথক পাহাড়ধসের এসব ঘটনা ঘটে।
ভোরে ঘরের ওপর ধসে পড়ে পাহাড়, প্রাণ গেল আলী আকবরের
ভোর প্রায় ৪টার দিকে কক্সবাজার সদর উপজেলার ছাত্তারের ঘোনা এলাকায় পাহাড়ের একটি বড় অংশ ধসে পড়ে আলী আকবরের (৪৫) বসতঘরের ওপর। এতে তিনি ও পরিবারের আরও তিন সদস্য মাটির নিচে চাপা পড়েন।
স্থানীয়দের তাৎক্ষণিক উদ্ধার অভিযানে তাঁদের কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক আলী আকবরকে মৃত ঘোষণা করেন। পরিবারের অপর দুই সদস্য বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
কক্সবাজার সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ মোহাম্মদ আলী বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, টানা বৃষ্টিতে জেলার বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ধসের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি বসতি থেকে মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কাজ চলছে।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে তিন দফা পাহাড়ধস, নিহত ৮
এর আগে রাত দেড়টার দিকে উখিয়ার জামতলী আশ্রয়শিবিরের (ক্যাম্প-১৫) ডি-৬ ব্লকে পাহাড়ধসে একটি বসতঘর চাপা পড়ে। এতে একই পরিবারের তিনজন—কামাল হোসাইন (৪৪), তাঁর স্ত্রী হুমায়রা বেগম (৩৯) এবং চার বছরের ছেলে মোহাম্মদ আনাস নিহত হন। পরিবারের আরও দুজন আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
রাত দুইটার দিকে কুতুপালং আশ্রয়শিবিরের (ক্যাম্প-৭) ডি-৭ ব্লকে আরেকটি পাহাড়ধসে রশিদ উল্লাহর সাত বছর বয়সী ছেলে মো. একরামের মৃত্যু হয়।
সবশেষে রাত সাড়ে তিনটার দিকে বালুখালী আশ্রয়শিবিরের (ক্যাম্প-১১) সি-১১ ব্লকে পাহাড়ধসে একই পরিবারের চারজন নিহত হন। তারা হলেন উম্মে হাবিবা (২৭), তাঁর বোন তানজিনা আক্তার (১৩), ভাই হারুনুর রশিদ (৩) এবং মোহাম্মদ রিহান (৫)।
ফায়ার সার্ভিস, এপিবিএন ও রোহিঙ্গা স্বেচ্ছাসেবীরা রাতভর অভিযান চালিয়ে নিহতদের মরদেহ উদ্ধার করেন।
প্রশাসনের সতর্কতা, আরও ধসের আশঙ্কা
উখিয়া ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশনের কর্মকর্তা ডলার ত্রিপুরা বলেন, টানা অতি ভারী বৃষ্টির কারণে পাহাড়ের মাটি নরম হয়ে গেছে। ফলে যেকোনো সময় নতুন করে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটতে পারে। পাহাড়ের ঢালে বসবাসকারী পরিবারগুলোকে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালে উখিয়া ও টেকনাফের প্রায় আট হাজার একর বনভূমিতে ৩৪টি রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির গড়ে তোলা হয়। বর্তমানে ৩৩টি শিবিরে প্রায় সাড়ে ১৪ লাখ রোহিঙ্গা বসবাস করছেন। এর মধ্যে অন্তত ৮০ হাজার মানুষ ভূমিধসের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছেন। প্রতি বর্ষা মৌসুমেই পাহাড়ধসে প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে।
২৪ ঘণ্টায় ২৫০ মিলিমিটার বৃষ্টি
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, রোববার দুপুর থেকে কক্সবাজারে টানা বৃষ্টি হচ্ছে। সোমবার সকাল ৬টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় জেলায় ২৫০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
কক্সবাজার আবহাওয়া অধিদপ্তরের সহকারী আবহাওয়াবিদ আবদুল হান্নান জানান, বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত সুস্পষ্ট লঘুচাপ এবং সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে আগামী আরও দুই দিন ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। এতে পাহাড়ধস, আকস্মিক জলাবদ্ধতা ও নিচু এলাকায় দুর্যোগের ঝুঁকি আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।






