বাণিজ্য- ডেস্ক
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশের পোশাক কারখানায় অতিরিক্ত গরম শ্রমিকদের জন্য স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ানোর পাশাপাশি উৎপাদন ও ব্যবসায়িক ক্ষতির কারণ হয়ে উঠছে। তবে কারখানায় শীতলীকরণ ব্যবস্থায় বিনিয়োগ করলে সেই ক্ষতি কমানোর পাশাপাশি উৎপাদক ও বৈশ্বিক পোশাক ব্র্যান্ড—দুই পক্ষই আর্থিকভাবে লাভবান হতে পারে। এমনকি এ ধরনের বিনিয়োগের অর্থ চার বছরের মধ্যেই উঠে আসতে পারে।
রোববার প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্লোবাল লেবার ইনস্টিটিউটের গবেষকেরা বাংলাদেশের পোশাক কারখানার ওপর গবেষণা করে এ তথ্য জানিয়েছেন। গবেষণার তথ্য ও প্রতিবেদনটি রয়টার্সে প্রকাশিত হয়েছে।
গবেষকেরা বলছেন, কারখানার ছাদে তাপ নিরোধক ব্যবস্থা, প্রতিফলক রং ব্যবহার এবং বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা উন্নত করার মতো উদ্যোগে বিনিয়োগ করে কর্মপরিবেশ তুলনামূলকভাবে ঠান্ডা রাখা সম্ভব। এর ফলে শ্রমিকদের কর্মক্ষমতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়ার পাশাপাশি অতিরিক্ত গরমের কারণে যে আর্থিক ক্ষতি হয়, তা কমানো যাবে।
কারখানার ভেতরেই বেশি গরম
গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের পোশাক কারখানাগুলোর ভেতরের তাপমাত্রা অনেক সময় বাইরের তাপমাত্রার চেয়েও বেশি থাকে। বিশেষ করে ইস্তিরি ও ফিনিশিং বিভাগের শ্রমিকদের সবচেয়ে বেশি গরমের মধ্যে কাজ করতে হয়।
ঢাকার আটটি পোশাক কারখানায় টানা ছয় মাস তাপমাত্রা পরিমাপ করে গবেষকেরা এসব তথ্য পেয়েছেন। তাঁদের হিসাব অনুযায়ী, অতিরিক্ত গরমের কারণে কারখানাগুলোর বার্ষিক আয়ের গড়ে ৪ দশমিক ১ শতাংশ ক্ষতি হয়েছে।
ফলে বিষয়টি শুধু শ্রমিকদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না; উৎপাদক ও বৈশ্বিক পোশাক ব্র্যান্ডগুলোর জন্যও এটি আর্থিক ঝুঁকি তৈরি করছে।
বিনিয়োগের খরচ ভাগ করতে বলছেন গবেষকেরা
গ্লোবাল লেবার ইনস্টিটিউটের গবেষকেরা শীতলীকরণ ব্যবস্থার জন্য কীভাবে বিনিয়োগ করা যায়, তার একটি মডেলও দিয়েছেন। তাঁদের পরামর্শ, এ ধরনের বিনিয়োগের পুরো ব্যয় শুধু পোশাক কারখানার মালিক বা সরবরাহকারীদের ওপর চাপানো উচিত নয়। পণ্যের দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে ব্র্যান্ডগুলোও এর একটি অংশ বহন করতে পারে।
প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক জেসন জাড রয়টার্সকে বলেন, প্রতিবেদনের মাধ্যমে ক্রেতা ও সরবরাহকারী—উভয় পক্ষই বুঝতে পারবে, অতিরিক্ত তাপ মোকাবিলায় কী পরিমাণ বিনিয়োগ প্রয়োজন।
জাড বলেন, কারখানার তাপমাত্রা কমানোর জন্য বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে পোশাক ব্র্যান্ডগুলোর আগ্রহ গত এক বছরে বেড়েছে। আলোচনায় তারা জানতে চেয়েছে, শ্রমিকদের জন্য তাপ নিয়ন্ত্রণে বিনিয়োগ করলে কত সময়ের মধ্যে সেই অর্থ উঠে আসতে পারে।
একই সঙ্গে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্যমাত্রা, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার ব্যয় এবং বিকল্প জ্বালানির উৎস নিয়েও ব্র্যান্ডগুলো উৎপাদনকারীদের সঙ্গে আলোচনা করছে বলে জানান তিনি।
দক্ষিণ এশিয়ায় বাড়ছে তাপের অর্থনৈতিক ঝুঁকি
অতিরিক্ত তাপের প্রভাব শুধু বাংলাদেশের পোশাকশিল্পেই সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে দক্ষিণ এশিয়ায় প্রতিবছর প্রায় ৩ কোটি ১০ লাখ পূর্ণকালীন চাকরির সমপরিমাণ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে।
বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ২০৫০ সালের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রায় ৭ শতাংশ কমে যেতে পারে বলে প্রতিবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। অথচ একই সময়ে এ অঞ্চলে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা আরও প্রায় ২৮ কোটি বাড়ার কথা।
অর্থাৎ, ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা ভবিষ্যতে দক্ষিণ এশিয়ার কর্মসংস্থান, উৎপাদনশীলতা ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি করতে পারে।
রপ্তানিতেও পড়তে পারে বড় ধাক্কা
তিন বছর আগের একটি গবেষণায় বলা হয়েছিল, অতিরিক্ত গরম ও বন্যার কারণে ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ, কম্বোডিয়া, পাকিস্তান ও ভিয়েতনামের পোশাক রপ্তানি আয় থেকে সম্মিলিতভাবে ৬৫ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত কমে যেতে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সরবরাহব্যবস্থাজুড়ে যে ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, পোশাকশিল্পের বৈশ্বিক অংশীজনেরা ধীরে ধীরে তা উপলব্ধি করছেন। তবে এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলো বাস্তবে কতটা অর্থ বিনিয়োগ করবে, সেটি এখনো অনিশ্চিত।
‘অতিরিক্ত তাপ নতুন বাস্তবতা’
গত সপ্তাহে আমেরিকান অ্যাপারেল অ্যান্ড ফুটওয়্যার অ্যাসোসিয়েশন (এএএফএ) চরম তাপমাত্রা থেকে শ্রমিকদের সুরক্ষায় একটি নির্দেশিকা প্রকাশ করেছে।
সংগঠনটি বলেছে, কোনো একটি কারখানার পক্ষে এককভাবে শীতলীকরণ ব্যবস্থায় বিনিয়োগ করে পর্যাপ্ত আর্থিক সুফল পাওয়া সম্ভব নাও হতে পারে। তাই শ্রমিকদের কর্মপরিবেশ উন্নয়নের ব্যয়ের একটি অংশ পোশাক ব্র্যান্ডগুলোর বহন করা উচিত।
এএএফএর নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট নেট হারম্যান বলেন, অতিরিক্ত তাপমাত্রা ধীরে ধীরে নতুন বাস্তবতায় পরিণত হচ্ছে। এই পরিস্থিতি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। তাই বৈশ্বিক পোশাক সরবরাহব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শক্তি শ্রমিকদের সুরক্ষায় এখনই কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
BANGLA TODAY আজকের বাংলা