সংসদীয় বাছাই কমিটির প্রস্তাবে মতভিন্নতা, আলোচনায় নতুন ধারণা
ডেস্ক রিপোর্ট- বাংলা টুডে
নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার বিষয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে রাজনৈতিক ঐকমত্য থাকলেও এই সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগের পদ্ধতি নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা কাটেনি। প্রধান উপদেষ্টা কীভাবে বাছাই করা হবে এবং মতবিরোধ দেখা দিলে তার সমাধান কীভাবে হবে, তা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে।
জুলাই জাতীয় সনদে সংসদীয় বাছাই কমিটির মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচনের প্রস্তাবে ঐকমত্য হয়েছে। তবে বাছাইয়ের বিভিন্ন ধাপ ও বিকল্প পদ্ধতি নিয়ে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ কয়েকটি দলের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাঠামো নির্ধারণে অংশীজনদের কাছ থেকে প্রস্তাব নিচ্ছে। এরই মধ্যে সরকার গঠনের বিকল্প একটি ধারণাও সামনে এসেছে। তবে এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা নিয়ে রাজনৈতিক বিরোধ বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের সংকটের অন্যতম কারণ। এ বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কার্যকর সমঝোতা প্রতিষ্ঠা করা না গেলে ভবিষ্যতে আবারও রাজনৈতিক সংকট তৈরি হতে পারে।
বর্তমান সরকারও তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার পক্ষে। গত রোববার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠানের বিষয়ে রাজনৈতিক সমঝোতা হয়েছে। সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে এ ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ।
অতীতের অভিজ্ঞতা ও বিতর্ক
১৯৯১ সালে অন্তর্বর্তীকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও তখন সংবিধানে এ ধরনের সরকারের বিধান ছিল না। রাজনৈতিক আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৯৬ সালে ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা যুক্ত করা হয়।
ওই ব্যবস্থায় প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগের ক্ষেত্রে সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছিল। তাঁকে পাওয়া না গেলে বা তিনি দায়িত্ব নিতে অসম্মতি জানালে পর্যায়ক্রমে অন্য অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি ও আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিদের বিবেচনায় নেওয়ার বিধান ছিল। এসব বিকল্পেও সমাধান না হলে রাষ্ট্রপতি রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে পরামর্শ করে একজনকে প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ দিতে পারতেন। শেষ পর্যন্ত কাউকে পাওয়া না গেলে রাষ্ট্রপতি নিজেই এ দায়িত্ব পালন করতে পারতেন।
২০০৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন নিয়ে বড় ধরনের রাজনৈতিক বিরোধ দেখা দেয়। তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগের অভিযোগ ছিল, পছন্দের ব্যক্তিকে প্রধান উপদেষ্টা করার উদ্দেশ্যে বিচারপতিদের অবসরের বয়সসীমা বাড়ানো হয়েছিল। এ নিয়ে আন্দোলন ও সংঘাতের একপর্যায়ে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি জরুরি অবস্থা জারি হয়। পরে ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব নেয়। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এ ঘটনা ‘ওয়ান-ইলেভেন’ নামে পরিচিত।
২০১১ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করা হয়। পরে আপিল বিভাগের রায়ে এ ব্যবস্থার সাংবিধানিক বিধান পুনরুজ্জীবিত করার কথা বলা হয়।
জুলাই সনদে প্রধান উপদেষ্টা বাছাইয়ের প্রস্তাব
জুলাই সনদে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের জন্য একটি সংসদীয় বাছাই কমিটির প্রস্তাব করা হয়েছে। এ কমিটি প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচন করবে। পরে প্রধান উপদেষ্টা কমিটির সঙ্গে পরামর্শ করে সর্বোচ্চ ১৫ জন উপদেষ্টা নিয়োগের জন্য বেছে নেবেন।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় অংশ নেওয়া ৩০টি রাজনৈতিক দল ও জোট এ প্রস্তাবে একমত হয়েছিল। তবে প্রধান উপদেষ্টা বাছাইয়ের পদ্ধতি এবং মতবিরোধ নিরসনের বিকল্প ব্যবস্থা নিয়ে মতপার্থক্য রয়ে গেছে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, বাছাই কমিটিতে থাকবেন প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা, স্পিকার, বিরোধী দল থেকে নির্বাচিত ডেপুটি স্পিকার এবং সংসদের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিরোধী দলের একজন প্রতিনিধি।
কমিটি গঠনের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল, সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী দল এবং স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যদের কাছ থেকে প্রধান উপদেষ্টা পদের জন্য যোগ্য ব্যক্তিদের নাম চাওয়া হবে। প্রতিটি রাজনৈতিক দল এবং স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য একজন করে প্রার্থীর নাম প্রস্তাব করতে পারবেন। কমিটি নিজ উদ্যোগেও সম্ভাব্য প্রার্থীদের নাম অনুসন্ধান করতে পারবে।
পরবর্তী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে কমিটির সদস্যরা প্রস্তাবিত নামগুলো নিয়ে আলোচনা করে একজনকে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে বেছে নেবেন। নির্বাচিত ব্যক্তিকে রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দেবেন।
জুলাই সনদে আরও বলা হয়েছে, নির্ধারিত ১২০ ঘণ্টার মধ্যে প্রধান উপদেষ্টার বিষয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো না গেলে বিকল্প প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে। এ পর্যায়ে সংসদের সরকারি দল বা জোট পাঁচজন, প্রধান বিরোধী দল বা জোট পাঁচজন এবং দ্বিতীয় বৃহত্তম বিরোধী দল দুজনের নাম প্রস্তাব করবে। স্পিকার নামগুলো প্রকাশ করবেন। এরপর সরকারি দল ও প্রধান বিরোধী দল পরস্পরের প্রস্তাবিত তালিকা থেকে একজন করে বেছে নেওয়ার সুযোগ পাবে। নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে মনোনীত হবেন।
এ পর্যায়েও সমাধান না এলে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বিচার বিভাগের দুজন প্রতিনিধি বাছাই কমিটিতে যুক্ত হবেন। তাঁরা কোনো প্রার্থীর নাম প্রস্তাব করতে পারবেন না। সাত সদস্যের কমিটি স্পিকারের তত্ত্বাবধানে র্যাঙ্কড চয়েজ পদ্ধতিতে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে একজনকে বেছে নেবে।
এই পর্যায়ের প্রক্রিয়া নিয়ে বিএনপির ভিন্নমত রয়েছে। ফলে প্রধান উপদেষ্টা বাছাইয়ের বিকল্প পদ্ধতিই এখন রাজনৈতিক মতপার্থক্যের অন্যতম প্রধান জায়গা।
জুলাই সনদে বলা হয়েছে, এসব পদ্ধতিতেও প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচন করা সম্ভব না হলে ত্রয়োদশ সংশোধনীর বিধান অনুসরণের ব্যবস্থা রাখা হবে। তবে এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করা যাবে না। এ প্রস্তাবে বিএনপি, জামায়াতসহ ২৮টি দল একমত হয়েছিল।
উচ্চকক্ষ থেকে সরকার গঠনের নতুন ধারণা
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাঠামো নিয়ে আলোচনায় নতুন একটি ধারণা সামনে এসেছে। গত শনিবার সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির আলোচনায় সংসদের উচ্চকক্ষ থেকে নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের সম্ভাবনা নিয়ে কথা হয়।
এ ধারণা অনুযায়ী, উচ্চকক্ষের মেয়াদ নিম্নকক্ষের চেয়ে বেশি হতে পারে। উচ্চকক্ষের স্পিকারকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করার প্রস্তাবও আলোচনায় এসেছে। এ ক্ষেত্রে উপরাষ্ট্রপতির পদ সৃষ্টি করে তাঁকে উচ্চকক্ষের স্পিকারের দায়িত্ব দেওয়ার বিকল্প প্রস্তাব রয়েছে। আরেকটি ধারণা হলো, সরকারি দল ও বিরোধী দলের সম্মতিতে উচ্চকক্ষের স্পিকার নির্বাচিত হবেন এবং তাঁকেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করা হবে। অন্য উপদেষ্টাদেরও দুই পক্ষের সম্মতিতে উচ্চকক্ষ থেকে নিয়োগ দেওয়ার প্রস্তাব এসেছে।
তবে বিশেষ কমিটির সভায় এসব প্রস্তাবের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। প্রস্তাবগুলো কতটা বাস্তবসম্মত এবং নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকারের উদ্দেশ্য পূরণে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়েও আলোচনা প্রয়োজন।
সাবেক জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্য বদিউল আলম মজুমদার প্রথম আলোকে বলেন, উচ্চকক্ষের স্পিকারকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করা হলে এ ধরনের সরকারের মূল উদ্দেশ্য পূরণ হবে না। কারণ, স্পিকার হবেন একজন রাজনৈতিক ব্যক্তি। এতে জটিলতা আরও বাড়তে পারে।
তিনি বলেন, নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকার প্রয়োজন এবং তা অবশ্যই ঐকমত্যের ভিত্তিতে গঠন করতে হবে। জুলাই সনদে এ বিষয়ে বেশ কিছু প্রস্তাবে ঐকমত্য রয়েছে। এখন প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা। এ সদিচ্ছা দেখাতে ব্যর্থ হলে দেশ বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়তে পারে।
রাষ্ট্রপতি ও বিচার বিভাগকে বাইরে রাখার প্রশ্ন
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের প্রক্রিয়া থেকে রাষ্ট্রপতি ও বিচার বিভাগকে দূরে রাখার পক্ষে মত দিয়েছিলেন অনেকে। সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির আলোচনাতেও অংশীজনদের একটি অংশ একই ধরনের পরামর্শ দিচ্ছেন।
এতে প্রধান উপদেষ্টা বাছাইয়ের দায়িত্ব কার হাতে থাকবে, তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। সংসদীয় বাছাই কমিটির মাধ্যমে সমাধান খোঁজার পাশাপাশি উচ্চকেন্দ্রিক বিকল্প কাঠামোর প্রস্তাবও সামনে এসেছে। তবে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতা ছাড়া কোনো পদ্ধতি চূড়ান্ত করা হলে ভবিষ্যতে নির্বাচনকালীন সরকার গঠন নিয়ে আবারও বিরোধ দেখা দিতে পারে।
দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা বলছে, নির্বাচনকালীন সরকারের গ্রহণযোগ্যতা শুধু সাংবিধানিক বিধানের ওপর নির্ভর করে না; এর সঙ্গে রাজনৈতিক আস্থা ও নিরপেক্ষতার প্রশ্নও জড়িত। তাই তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার পাশাপাশি প্রধান উপদেষ্টা বাছাইয়ের পদ্ধতি নিয়েও সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে কার্যকর সমঝোতা প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।





