বিশেষ প্রতিনিধি-সুবীর পাল
এক ঘণ্টায় যে কাজ শেষ করা সম্ভব, সেই কাজের জন্য দিনের পর দিন, মাসের পর মাস ভূমি অফিসে ঘুরতে হচ্ছে—এমন অভিযোগ উঠেছে চট্টগ্রামের সাতকানিয়া সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ের সার্ভেয়ার/কানুনগো জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, কাজ শেষ করার বদলে তিনি শুধু একের পর এক তারিখ দেন। নির্ধারিত তারিখে গেলে আবার নতুন তারিখ। এভাবে তারিখের পর তারিখ পেরিয়ে গেলেও অনেক কাজের কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি থাকে না।
জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে অভিযোগের যেন শেষ নেই—এমন দাবি করেছেন তাঁর কাছে সেবা নিতে আসা একাধিক ভুক্তভোগী। তাঁদের অভিযোগ, ভূমিসংক্রান্ত ছোটখাটো কাজ নিয়েও দিনের পর দিন ঘুরতে হয়। কেউ সপ্তাহের পর সপ্তাহ, আবার কেউ মাসের পর মাস অফিসে আসা-যাওয়া করেও কাঙ্ক্ষিত সেবা পাচ্ছেন না।
ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, জাহাঙ্গীর আলমের কাছে গেলে প্রথমে একটি তারিখ দেওয়া হয়। সেই তারিখে গিয়ে কাজ না হলে আবার আরেকটি তারিখ দেওয়া হয়। এভাবেই চলতে থাকে তারিখের পর তারিখ। ফলে দূর-দূরান্ত থেকে আসা সাধারণ মানুষকে একাধিকবার যাতায়াত করতে হচ্ছে। এতে তাঁদের সময় ও অর্থ দুটোই নষ্ট হচ্ছে।
শুধু তাই নয়, নিজ হাতে নথি গ্রহণ করার পরও পরে সেই নথির হদিস না পাওয়ার অভিযোগও রয়েছে জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগীদের দাবি, নথি জমা দেওয়ার পর কাজের অগ্রগতি জানতে গেলে কখনো অপেক্ষা করতে বলা হয়, কখনো দেওয়া হয় নতুন তারিখ। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট নথি কোথায় আছে, সেটিও স্পষ্টভাবে জানানো হয় না বলে অভিযোগ তাঁদের।
একাধিক ভুক্তভোগী বলেন, জাহাঙ্গীর আলমের কাছে কাজ করিয়ে নিতে বারবার অনুরোধ করেও তাঁরা কোনো সুফল পাননি। এমনকি পরিচিতজনের সুপারিশ কিংবা বিভিন্নভাবে অনুরোধ করার পরও কাজ এগোয়নি বলে অভিযোগ তাঁদের।
কেউ কান্নায় ভেঙে পড়ছেন
সাতকানিয়া ভূমি অফিসে সেবা নিতে এসে জাহাঙ্গীর আলমের কক্ষের সামনে অপেক্ষমাণ কয়েকজন ভুক্তভোগীর সঙ্গে কথা বলে তাঁদের দীর্ঘ ভোগান্তির কথা জানা যায়। তাঁদের কয়েকজনের অভিযোগ, দিনের পর দিন অফিসে এসে অপেক্ষা করেও কাজ শেষ না হওয়ায় তাঁরা চরম হতাশ।
এক ভুক্তভোগী বলেন, “একটা কাজের জন্য কতবার যে অফিসে আসতে হয়েছে, তার হিসাব নেই। প্রতিবারই নতুন তারিখ দেওয়া হয়। কিন্তু কাজ শেষ হয় না।”
আরেক ভুক্তভোগীর ভাষ্য, “আমাদের মতো সাধারণ মানুষের কাজ ফেলে বারবার অফিসে আসা সম্ভব নয়। একদিনের কাজের জন্য যদি মাসের পর মাস ঘুরতে হয়, তাহলে আমরা যাব কোথায়?”
অভিযোগকারীদের কেউ কেউ বলেন, দীর্ঘদিন ধরে হয়রানির কারণে তাঁরা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। ভূমি অফিসে এসে কাজ না হওয়া এবং বারবার নতুন তারিখ পাওয়ার ঘটনায় কোনো কোনো ভুক্তভোগীকে কান্নায় ভেঙে পড়তেও দেখা গেছে বলে জানান তাঁরা।

নথি নেন নিজ হাতে, পরে খোঁজ মেলে না—অভিযোগ
ভুক্তভোগীদের অন্যতম গুরুতর অভিযোগ, জাহাঙ্গীর আলম নিজ হাতে বিভিন্ন নথি গ্রহণ করলেও পরবর্তী সময়ে সেই নথির অবস্থান জানতে গেলে অনেক সময় সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায় না। ফলে নথি কোথায় আছে, কোন পর্যায়ে রয়েছে এবং কবে কাজ শেষ হবে—এসব নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়তে হয় সেবাপ্রত্যাশীদের।
তাঁদের প্রশ্ন, সরকারি একটি দপ্তরে একজন কর্মকর্তা বা কর্মচারীর কাছে নথি জমা দেওয়ার পর সেটির গতিবিধি জানার জন্য যদি একজন নাগরিককে বারবার ঘুরতে হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমবে কীভাবে?
সেবা নিতে এসে বাড়ছে ভোগান্তি
ভূমি অফিসে সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয় নামজারি, জমির মাপজোক, প্রতিবেদন, নথি যাচাইসহ বিভিন্ন সেবা। এসব কাজে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কার্যক্রম সম্পন্ন না হলে জমি কেনাবেচা, ব্যাংক ঋণ, উত্তরাধিকারসহ নানা বিষয়েও জটিলতা তৈরি হতে পারে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, এসব বাস্তবতা বিবেচনায় না নিয়ে জাহাঙ্গীর আলমের কাছে গেলে তাঁদের বারবার অপেক্ষা করতে হচ্ছে। একপর্যায়ে অনেকে হতাশ হয়ে পড়ছেন। কেউ কেউ বাধ্য হয়ে দালাল বা তদবিরকারীর দ্বারস্থ হচ্ছেন বলেও অভিযোগ করেছেন।
অভিযোগ অস্বীকার বা বক্তব্য—কোনোটিই মেলেনি
এসব অভিযোগের বিষয়ে জাহাঙ্গীর আলমের বক্তব্য জানতে তাঁর ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে তাঁর বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
তবে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই ও নথিপত্র পরীক্ষা ছাড়া এসব অভিযোগকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এ কারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে ভুক্তভোগীদের দাবি—অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে সত্যতা যাচাই করা হোক।
ভুক্তভোগীদের প্রশ্ন, ‘তারিখের শেষ কোথায়?’
সাতকানিয়া ভূমি অফিসে সেবা নিতে আসা মানুষের প্রশ্ন এখন একটাই—একটি কাজ শেষ করতে যদি বারবার তারিখ দেওয়া হয়, তাহলে সেই তারিখের শেষ কোথায়?
ভুক্তভোগীরা দ্রুত তদন্ত করে জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে ভূমি অফিসে সেবাপ্রত্যাশীদের হয়রানি বন্ধ করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সেবা নিশ্চিত করারও দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
BANGLA TODAY আজকের বাংলা