ডেস্ক রিপোর্ট- বাংলা টুডে
স্লাজ সরিয়ে পানি শোধন ও ওয়াকওয়ে সংস্কার, গড়ে উঠবে ‘নজরুল সরোবর’
রাজধানীর ধানমন্ডি লেকের দীর্ঘদিনের কাদা, বর্জ্য ও নাব্যতা সংকট কাটিয়ে আধুনিক বিনোদন ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে রূপ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। লেকের তলদেশে জমে থাকা প্রায় ১ লাখ ৬২ হাজার ৫৩৪ ঘনমিটার স্লাজ অপসারণে ব্যয় হবে প্রায় ২৬ কোটি টাকা। প্রায় এক বছর ধরে চলবে এই পুনঃখননকাজ। এরপর পানি শোধন, লেকের পাড় ও হাঁটার পথ সংস্কার, আলোকসজ্জা, সৌন্দর্যবর্ধনসহ ব্যাপক অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ করা হবে।
মঙ্গলবার সকালে ধানমন্ডি লেকের পুনঃখনন ও সামগ্রিক উন্নয়নকাজের উদ্বোধন করেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুস সালাম এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।
ডিএসসিসি সূত্র জানায়, ৩ দশমিক ১০ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং গড়ে ৫৬ মিটার প্রশস্ত ধানমন্ডি লেকের তলদেশে বছরের পর বছর ধরে বিপুল পরিমাণ কাদা ও বর্জ্য জমেছে। এতে লেকের নাব্যতা কমার পাশাপাশি পরিবেশ ও নান্দনিকতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এবার এসব স্লাজ অপসারণ করে লেকটির স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রতিদিন প্রায় ৭০০ ঘনমিটার স্লাজ অপসারণ করা হবে। এ কাজে ব্যবহার করা হবে দুটি ভাসমান এক্সক্যাভেটর ও চারটি বার্জ। পুরো পুনঃখননকাজ শেষ করতে সময় লাগবে প্রায় এক বছর।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে শেখ রবিউল আলম বলেন, ধানমন্ডি লেকের সার্বিক উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা তাঁর নির্বাচনী অঙ্গীকার ছিল। প্রধানমন্ত্রী এ–সংক্রান্ত দুটি প্রকল্প অনুমোদন করেছেন। এর প্রথম ধাপ হিসেবে লেকের তলদেশের স্লাজ অপসারণ শুরু হয়েছে। বিস্তারিত নকশা অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে পুরো লেক সংস্কার করা হবে।
লেকের পরিবেশ রক্ষায় দর্শনার্থী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সচেতন থাকার আহ্বান জানান তিনি।
৭৫ কোটি টাকার মহাপরিকল্পনা
শুধু লেকের তলদেশ পরিষ্কার করেই থেমে থাকছে না ডিএসসিসি। ধানমন্ডি লেককে আধুনিক বিনোদন, শরীরচর্চা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের উপযোগী করে তুলতে নেওয়া হয়েছে ৭৫ কোটি টাকার মাস্টারপ্ল্যান।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, লেক ও এর অবকাঠামো সংস্কারে ব্যয় হবে ৫০ কোটি টাকা। আর কবি কাজী নজরুল ইসলামের নামে ‘নজরুল সরোবর’ বা ‘বিদ্রোহী চত্বর’ নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে আরও ২৫ কোটি টাকা।
ডিএসসিসির প্রশাসক মো. আবদুস সালাম জানান, তলদেশ পরিষ্কারের পরপরই লেকের পানি শোধন, সাইডওয়াল সংস্কার, ওয়াকওয়ে আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ এবং সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ শুরু হবে। থাকবে আধুনিক আলোকসজ্জা ও নিরাপত্তাব্যবস্থাও।
লেকের পাড় সুরক্ষিত করতে ঢাল স্থিতিশীল করা, আধুনিক নিষ্কাশনব্যবস্থা গড়ে তোলা, হাঁটার পথ সংস্কার, সীমানাপ্রাচীর ও নিরাপত্তা রেলিং মেরামত করা হবে। পাশাপাশি বসানো হবে সিসিটিভি ক্যামেরা, ঘোষণা দেওয়ার ব্যবস্থা ও নির্দেশনামূলক সাইনবোর্ড।
বিনোদনের জন্য তৈরি হবে তিনটি ভাসমান ডেক, কিয়স্ক, আধুনিক জিম, ক্যাফেটেরিয়া, ব্যাডমিন্টন কোর্ট ও উন্মুক্ত ব্যায়ামাগার। শিশুদের জন্য স্পিডবোটের সুযোগ রাখার পরিকল্পনাও রয়েছে। থাকবে পার্কিংয়ের ব্যবস্থা।
শুধু মানুষ নয়, লেকের সবুজ পরিবেশের কথাও রাখা হয়েছে পরিকল্পনায়। উদ্ভিদের চিকিৎসার জন্য বিশেষায়িত ‘ট্রি হাসপাতাল’, নিরাপদ খাবার পানি এবং জনবান্ধব শৌচাগার নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
রবীন্দ্র সরোবরের আদলে ‘নজরুল সরোবর’
ধানমন্ডি লেক উন্নয়ন পরিকল্পনার সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ ‘নজরুল সরোবর’ বা ‘বিদ্রোহী চত্বর’। কবি নজরুল ইনস্টিটিউটের ঠিক বিপরীতে ধানমন্ডির ১৩/এ ও ৮/এ সড়কের পাশে ৫০ দশমিক ৯৬৭ কাঠা জায়গায় এটি নির্মাণ করা হবে।

রবীন্দ্র সরোবরের আদলে পরিকল্পিত এই উন্মুক্ত সাংস্কৃতিক পরিসরে থাকবে নজরুলসংগীত, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও বিভিন্ন আলোচনা আয়োজনের জন্য অ্যাম্ফিথিয়েটার। থাকবে গ্রিনরুমও।
কবি কাজী নজরুল ইসলামের জীবন, সাহিত্য ও বিদ্রোহী চেতনাকে তুলে ধরতে থাকবে বুক কর্নার, লাইব্রেরি ও বিভিন্ন তথ্যফলক। পাশাপাশি নগর বন, প্লাজা ও লেকের ঘাট নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
এই সাংস্কৃতিক চত্বরে থাকছে আরও একটি ব্যতিক্রমী আয়োজন—কবি নজরুলের পছন্দের খাবার পরিবেশনের জন্য বিশেষ রেস্তোরাঁ ও ক্যাফে।
ডিএসসিসি জানিয়েছে, লেকের তলদেশ থেকে স্লাজ অপসারণ শেষ হওয়ার পর মূল সংস্কারকাজ এবং ‘নজরুল সরোবর’ নির্মাণের কাজ একযোগে বাস্তবায়ন করা হবে। পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে দীর্ঘদিনের জীর্ণতা কাটিয়ে ধানমন্ডি লেক রাজধানীর অন্যতম বড় উন্মুক্ত সাংস্কৃতিক ও বিনোদনকেন্দ্রে পরিণত হবে।
BANGLA TODAY আজকের বাংলা