রাজউকের অনুমোদন ছাড়াই বহুতল ভবন নির্মাণের অভিযোগ-মহাখালী ওয়্যারলেস গেইটে ঝুঁকিতে এলাকাবাসী, অর্ধনির্মিত ভবনে ভাড়াটে-বাণিজ্যিক কার্যক্রম

ডেস্ক রিপোর্ট-বাংলা টুডে

রাজধানীর মহাখালী ওয়্যারলেস গেইট এলাকার ৫/সি নম্বর রোডের জ-১৫২ নম্বর হোল্ডিংয়ে রাজউকের অনুমোদিত নকশা ও ইমারত নির্মাণ বিধিমালা না মেনে বহুতল ভবন নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ভবনটির মালিক লতিফ হোসেন প্রভাব খাটিয়ে নির্মাণকাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। এতে আশপাশের ভবন ও পথচারীদের নিরাপত্তা ঝুঁকির পাশাপাশি এলাকায় তৈরি হয়েছে পরিবেশগত নানা সমস্যা।

সরেজমিনে দেখা যায়, নির্মাণাধীন ভবনটির চারপাশে পর্যাপ্ত জায়গা না রেখেই দেয়াল ও অন্যান্য কাঠামোর কাজ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বহুতল ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে বিধিমালা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সেটব্যাক রাখার বিধান থাকলেও সংশ্লিষ্ট জায়গায় তা মানা হয়নি বলে স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি। এতে গলির চলাচলের জায়গাও সংকুচিত হয়ে পড়েছে।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, নির্মাণকাজ চললেও ভবনটির চারপাশে পর্যাপ্ত নিরাপত্তাবেষ্টনী নেই। ফলে ওপর থেকে নির্মাণসামগ্রী পড়ে পথচারী বা আশপাশের বাসিন্দাদের আহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। নির্মাণকাজের সময় নিরাপত্তাব্যবস্থা না থাকায় যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে তাঁরা আশঙ্কা করছেন।

অর্ধনির্মিত ভবনে ভাড়াটে, চলছে বাণিজ্যিক কার্যক্রম

স্থানীয় বাসিন্দাদের আরও অভিযোগ, ভবনটির নির্মাণকাজ পুরোপুরি শেষ না হলেও এর বিভিন্ন অংশে ভাড়াটে তোলা হয়েছে। আবাসিক এলাকা হওয়া সত্ত্বেও ভবনটির নিচতলা ও অন্যান্য অংশে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য ভাড়া দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

এলাকাবাসীর দাবি, অর্ধনির্মিত ভবনে মানুষের বসবাস ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম চলায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরও বাড়ছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাসিন্দা বলেন, “ভবনটির চারপাশে নিরাপত্তাবেষ্টনী নেই। ওপর থেকে প্রায়ই নির্মাণসামগ্রী নিচে পড়ে। যেকোনো সময় কারও মাথায় পড়ে বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। বৃষ্টি হলে বা ছাদের পানির ট্যাংক উপচে পড়লে সেই পানি রাস্তায় ও আশপাশের বাড়িতে ঢুকে যায়।”

অন্যের ড্রেনে পয়োনিষ্কাশনের পাইপ দেওয়ার অভিযোগ

ভবনটির নিজস্ব ড্রেনেজ ব্যবস্থা নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় এক বাসিন্দার অভিযোগ, “ভবন নির্মাণের সময় আলাদা কোনো ড্রেনেজ ব্যবস্থা করা হয়নি। অন্য বাড়ির ড্রেনে এই ভবনের পয়োনিষ্কাশনের পাইপ সংযোগ দেওয়া হয়েছে। এ কারণে সামান্য বৃষ্টিতেই গলির রাস্তায় পানি জমে যায়।”

আরেক বাসিন্দা বলেন, ভবনের জানালা দিয়ে নিচে ময়লা-আবর্জনা ফেলা হচ্ছে। এতে আশপাশের গলিতে ময়লা জমে মশার উপদ্রব বেড়েছে এবং পরিবেশেরও ক্ষতি হচ্ছে।

অভিযোগ অস্বীকার মালিকের

অভিযোগের বিষয়ে ভবনটির মালিক লতিফ হোসেন বলেন, তিনি যথাযথ নিয়ম মেনেই ভবন নির্মাণ করছেন। স্থানীয়দের অভিযোগগুলো তিনি অস্বীকার করেন। তবে রাজউকের অনুমোদিত নকশা দেখাতে তিনি রাজি হননি।

এদিকে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ভবনটির সম্পত্তির বিপরীতে আইএফআইসি ব্যাংকের গুলশান শাখা থেকে ঋণ নেওয়া হয়েছে। নিয়মিত ঋণের কিস্তি পরিশোধ না হওয়ায় সম্প্রতি ভবনটিতে ব্যাংকের নোটিশ টাঙানো হয়েছে বলে জানা গেছে।

তবে ভবনটির অনুমোদন, ঋণ এবং নির্মাণকাজের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই করে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

তদন্তের আশ্বাস রাজউকের

অভিযোগের বিষয়ে রাজউকের সংশ্লিষ্ট জোনের অথোরাইজড অফিসার বলেন, “মহাখালীর ৫/সি রোডের এই ভবনটি নিয়ে আমরা বেশ কিছু মৌখিক অভিযোগ পেয়েছি। নকশাবহির্ভূতভাবে বা রাস্তার জায়গা দখল করে ভবন নির্মাণের কোনো সুযোগ নেই। আমরা দ্রুত একজন পরিদর্শক পাঠিয়ে তদন্ত করব। সত্যতা পাওয়া গেলে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

নগর ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী ড. এম. আমানুল্লাহ বলেন, “নির্মাণকাজের সময় নিরাপত্তাবেষ্টনী না থাকা ঝুঁকিপূর্ণ। আবাসিক ভবনে অনুমোদনহীন বাণিজ্যিক কার্যক্রম এবং অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা নগরবাসীর জন্য ভোগান্তি তৈরি করতে পারে। অভিযোগগুলো দ্রুত যাচাই করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।”

এদিকে এলাকাবাসীর দাবি, ভবনটির অনুমোদিত নকশা, নির্মাণবিধি অনুসরণ, সেটব্যাক, ড্রেনেজ ব্যবস্থা, ব্যবহার ও নিরাপত্তাব্যবস্থা—সবকিছু সরেজমিন তদন্ত করা হোক। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, নির্মাণকাজ চলাকালে মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তাই বিষয়টি দ্রুত তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য রাজউক, সিটি করপোরেশন ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তাঁরা।

শেয়ার করুন :

Check Also

এক ঘণ্টার কাজ মাসেও শেষ হয় না, তারিখের পর তারিখ—সাতকানিয়া ভূমি অফিসে জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে হয়রানির অভিযোগ

বিশেষ প্রতিনিধি-সুবীর পাল এক ঘণ্টায় যে কাজ শেষ করা সম্ভব, সেই কাজের জন্য দিনের পর …