মায়ের মোবাইল নিয়ে দুপুরে বের হয়েছিল, ফেরেনি আর—সিসিটিভিতে তুহিনসহ চারজনের গতিবিধি, তদন্তে বেরিয়ে আসছে হত্যার নেপথ্যের তথ্য
ডেস্ক রিপোর্ট-বাংলা টুডে
দুপুরের নিস্তরঙ্গ ছুটির দিন। ঘরেই ছিল ১৩ বছরের ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম। কিছুক্ষণ পরই মায়ের মোবাইল ফোনটি সঙ্গে নিয়ে ছবি তুলতে বের হয় সে। কে জানত, কিশোর মনে ছবি তোলার সেই সামান্য আগ্রহই তাকে নিয়ে যাবে মৃত্যুর ফাঁদে! বাড়ি থেকে বের হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই লালমাই পাহাড়ের নির্জন জঙ্গলে নিভে যায় প্রাণোচ্ছল এই কিশোরের জীবন। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক ড. নাহিদা নাহিদের কোল খালি করে যাওয়া সেই হত্যাকাণ্ডের রহস্য এখন ধীরে ধীরে উন্মোচিত হচ্ছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, অপ্রতিমকে পরিকল্পিতভাবে বাসা থেকে বের করে নির্জন এলাকায় নেওয়া হয়েছিল। এ কাজে তাকে প্রথমে মোবাইল ফোনে একাধিক বার্তা পাঠানো হয়। পরে তার কাছে থাকা দামি আইফোন দিয়ে টিকটকের ভিডিও ও ছবি তোলার প্রস্তাব দেওয়া হয়। সেই প্রলোভনেই বেলা আড়াইটার দিকে বাসা থেকে বের হয় অপ্রতিম।
এরপর বিকেলে সিসিটিভি ক্যামেরায় তুহিনের সঙ্গে তাকে হাঁটতে দেখা যায়। আরও কয়েকটি ক্যামেরার ফুটেজে তাদের সঙ্গে আরও দুই কিশোরের উপস্থিতির তথ্য পাওয়া গেছে। পরে লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার লোকালয় থেকে দেড় কিলোমিটার ভেতরের নির্জন জঙ্গলে অপ্রতিমের ওপর হামলা হয় বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

যে ফোনের টোপে ঘর ছাড়ে অপ্রতিম
তদন্তকারীদের হাতে গ্রেপ্তার হওয়া এক আসামির মোবাইল ফোনে আসা কয়েকটি অস্বাভাবিক কলই যেন খুলে দেয় রহস্যের প্রথম দরজা। ওই যোগাযোগের সূত্র ধরে তদন্ত এগোতে থাকলে অপ্রতিমকে বাসা থেকে বের করে আনার পরিকল্পনার তথ্য সামনে আসে।
পুলিশ সূত্রের ভাষ্য, অপ্রতিমকে যেকোনোভাবে বাইরে নিয়ে আসাই ছিল তুহিনের উদ্দেশ্য। এজন্য তাকে বারবার মেসেজ পাঠানো হয়। একপর্যায়ে বলা হয়, অপ্রতিমের আইফোন দিয়ে সুন্দর ভিডিও ও ছবি করা হবে। কিশোর বয়সের স্বাভাবিক আগ্রহকে কাজে লাগিয়েই তাকে বাইরে নেওয়া হয় বলে তদন্তকারীদের ধারণা।
সেদিন বেলা আড়াইটার দিকে মায়ের মোবাইল ফোন সঙ্গে নিয়ে বাসা থেকে বের হয় অপ্রতিম। পরিবারের সদস্যরা ভাবেন, হয়তো বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে গেছে। কিন্তু সেই বের হওয়াই হয়ে ওঠে তার শেষবারের মতো ঘর ছাড়ার মুহূর্ত।
সিসিটিভিতে শেষ পথচলা
পুলিশ জানিয়েছে, বিকেল ৩টা থেকে ৩টা ১০ মিনিটের মধ্যে তুহিনের সঙ্গে অপ্রতিমের দেখা হয়। এরপর বিভিন্ন এলাকার অন্তত চারটি সিসিটিভি ক্যামেরায় তাদের গতিবিধি ধরা পড়ে।
ফুটেজে দেখা যায়, অপ্রতিম ও তুহিন পাশাপাশি হাঁটছে, কথা বলছে। বাইরে থেকে দেখলে তাদের মধ্যে কোনো অস্বাভাবিকতা বোঝার উপায় ছিল না। একটি ফুটেজে তাদের পেছনে আরও দুজনকে দেখা যায়। পরবর্তী একটি ফুটেজে চারজনকেই একসঙ্গে দেখা গেছে বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
এই পথ ধরেই তারা এগিয়ে যায় লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার দিকে।
লোকালয় থেকে দেড় কিলোমিটার দূরে
মূল সড়ক থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার ভেতরে আঁকাবাঁকা কাঁচা পথ পেরিয়ে ওই নির্জন স্থানে পৌঁছাতে হয়। চারপাশে জঙ্গল আর নীরবতা। স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে এবং ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে পুলিশও জায়গাটিকে অত্যন্ত নির্জন বলে জানিয়েছে।
তদন্তকারীদের ভাষ্য, সেখানে পৌঁছানোর পর অপ্রতিমের সঙ্গে আরও দুই কিশোরের দেখা হয়। শুক্রবার বিকেল গড়িয়ে তখন সন্ধ্যা নামার প্রস্তুতি নিচ্ছিল।
আইফোন কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা, তারপর আঘাত
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, বিকেল ৫টা থেকে ৬টার মধ্যে অপ্রতিমের হাত থেকে আইফোনটি নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু নিজের ফোনটি দিতে রাজি হয়নি সে। শুরু হয় ধস্তাধস্তি।
একপর্যায়ে তুহিন একটি বাঁশের লাঠি দিয়ে অপ্রতিমের মাথায় আঘাত করে বলে তদন্তে পাওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে পুলিশ জানিয়েছে। পরে অন্যরাও তার ওপর হামলা করে। গুরুতর আঘাতে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে কিশোরটি।
কিছুক্ষণ আগেও যে ছেলেটি ছবি তোলার স্বপ্নে বন্ধুদের সঙ্গে বের হয়েছিল, সেখানেই থেমে যায় তার জীবনের সব গল্প।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, হত্যার পর অপ্রতিমের মরদেহ ঘটনাস্থলে রেখে মোবাইল ফোনটি নিয়ে সেখান থেকে চলে যায় হামলাকারীরা।
ঘটনাস্থলে ছিলেন না সিয়াম, তবু নজরে
তদন্তে সিয়াম নামের আরেক তরুণের নামও এসেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ঘটনার সময় তিনি ঘটনাস্থলে ছিলেন না। তবে আশপাশে অবস্থান করে পাহারা দেওয়া বা অন্য কোনোভাবে সহযোগিতা করেছিলেন কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তদন্তকারীরা সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইল ফোনের কল ও যোগাযোগের তথ্য এবং অন্যান্য আলামত মিলিয়ে প্রত্যেকের ভূমিকা যাচাই করছেন।
মরদেহে আঘাতের চিহ্ন, চলছে ফরেনসিক পরীক্ষা
অপ্রতিমের মরদেহে মাথায় গুরুতর আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। শরীরের অন্য স্থানেও ক্ষত রয়েছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধারণা, এসব ক্ষতের কিছু মৃত্যুর পরও তৈরি হয়ে থাকতে পারে।
তাদের ভাষ্য, রাতে শিয়াল মরদেহটি টানাটানি করেছিল। তাই কোন ক্ষত হত্যাকাণ্ডের সময় সৃষ্টি হয়েছে এবং কোনগুলো পরে হয়েছে, তা নিশ্চিত করতে ময়নাতদন্ত ও ফরেনসিক তথ্য পর্যালোচনা করা হচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে শোক
অপ্রতিমের হত্যাকাণ্ডে শোক নেমে এসেছে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সোমবার সকালে শহীদ আব্দুল কাইয়ুম চত্বরে শিক্ষক সমিতির আয়োজনে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে সহকর্মীর সন্তান হারানোর ঘটনায় গভীর শোক ও সমবেদনা জানান শিক্ষকরা।
মানববন্ধনে বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. কামরুন নাহার শীলা তদন্তের সাম্প্রতিক অগ্রগতির তথ্য তুলে ধরেন।
একটি প্রাণোচ্ছল কিশোরের এমন নির্মম মৃত্যু শুধু তার পরিবার নয়, পুরো বিশ্ববিদ্যালয় সম্প্রদায়কে শোকাহত করেছে। আর সেই শোকের মধ্যেই এখন পরিবারের একটাই প্রত্যাশা—অপ্রতিমকে যারা এভাবে কেড়ে নিয়েছে, তদন্তের মাধ্যমে তাদের প্রত্যেকের ভূমিকা স্পষ্ট হোক এবং আইনের আওতায় আসুক।
BANGLA TODAY আজকের বাংলা