ডেস্ক রিপোর্ট- বাংলা টুডে
অস্ত্রভান্ডারে ১৯০ ওয়ারহেড, পাল্টা হামলার প্রস্তুতি জোরদার
যুদ্ধবিমান, স্থলভিত্তিক ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক সাবমেরিনে সক্ষমতা বাড়াচ্ছে নয়াদিল্লি
পারমাণবিক অস্ত্রের সক্ষমতা আরও বিস্তৃত করছে ভারত। যুদ্ধবিমান, স্থলভিত্তিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন—তিন মাধ্যমেই পারমাণবিক অস্ত্র বহনের সক্ষমতা গড়ে তুলেছে দেশটি। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান বুলেটিন অব দ্য অ্যাটমিক সায়েন্টিস্টসের (বিএএস) এক নতুন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডারে প্রায় ১৯০টি ওয়ারহেড থাকতে পারে। এসব অস্ত্রের কার্যকর ব্যবহার ও সম্ভাব্য পাল্টা হামলার সক্ষমতা নিশ্চিত করতে দেশটি ক্রমাগত আধুনিকায়ন করছে তার পারমাণবিক প্রতিরোধব্যবস্থা। খবর এনডিটিভির।
বিএএসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের পারমাণবিক সক্ষমতা এখন ত্রিমাত্রিক কাঠামোয় কার্যকর পর্যায়ে পৌঁছেছে। অর্থাৎ আকাশ, স্থল ও সমুদ্র—তিনটি মাধ্যম থেকেই পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে দেশটি। হ্যান্স এম. ক্রিস্টেনসেন, ম্যাট কোর্ডা, এলিয়ানা জনস ও ম্যাকেঞ্জি নাইট-বয়েল প্রণীত ওই প্রতিবেদনে ভারতের পারমাণবিক অস্ত্রের সম্ভাব্য সংখ্যা, বহনব্যবস্থা, ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা এবং সমুদ্রভিত্তিক সক্ষমতার বিস্তারিত বিশ্লেষণ তুলে ধরা হয়েছে।
ভারত দীর্ঘদিন ধরে ‘নো ফার্স্ট ইউজ’ বা প্রথমে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার না করার নীতি অনুসরণ করে আসছে। তবে কোনো দেশ ভারতের ওপর পারমাণবিক হামলা চালালে তার জবাবে ব্যাপক পাল্টা আঘাত হানার সক্ষমতা অর্জনকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে নয়াদিল্লি। এ লক্ষ্যেই দেশটি ‘অ্যাসিউরড সেকেন্ড স্ট্রাইক’ বা নিশ্চিত পাল্টা আঘাতের সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে মনোযোগী হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের পারমাণবিক অস্ত্র বহনে সক্ষম যুদ্ধবিমানের মধ্যে রয়েছে ফ্রান্সের তৈরি মিরাজ-২০০০ এবং যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের যৌথভাবে তৈরি জাগুয়ার। পুরোনো জাগুয়ার যুদ্ধবিমান পর্যায়ক্রমে অবসরে গেলে ফ্রান্স থেকে কেনা রাফাল যুদ্ধবিমান পারমাণবিক অস্ত্র বহনের ক্ষেত্রে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। এর ফলে আকাশপথে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের সক্ষমতা আরও আধুনিক ও শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
স্থলভিত্তিক পারমাণবিক সক্ষমতার ক্ষেত্রে ভারতের প্রধান নির্ভরতা অগ্নি ক্ষেপণাস্ত্র পরিবার। দেশটির প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থা (ডিআরডিও) এসব ক্ষেপণাস্ত্রের উন্নয়ন ও আধুনিকায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিএএসের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে ভারতের ছয় ধরনের পারমাণবিক অস্ত্র বহনে সক্ষম ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কার্যকর রয়েছে। এগুলো হলো পৃথ্বী-২, অগ্নি-১, অগ্নি-২, অগ্নি-৩, অগ্নি-৪ ও অগ্নি-৫। এ ছাড়া অগ্নি প্রাইম বা অগ্নি-পি পূর্ণাঙ্গভাবে মোতায়েনের কাছাকাছি রয়েছে।
প্রতিবেদনে ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর পাল্লা সম্পর্কে বলা হয়েছে, পৃথ্বী-২ ছাড়া অগ্নি পরিবারের বিভিন্ন ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা ক্রমান্বয়ে বাড়ানো হয়েছে। অগ্নি-১-এর পাল্লা প্রায় ৭০০ কিলোমিটার, অগ্নি-২-এর দুই হাজার কিলোমিটারের বেশি, অগ্নি-৩-এর তিন হাজার ২০০ কিলোমিটারের বেশি এবং অগ্নি-৪-এর তিন হাজার ৫০০ কিলোমিটারের বেশি। অন্যদিকে, অগ্নি-৫-এর পাল্লা ছয় হাজার কিলোমিটারের কম বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ভারতের দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান অগ্নি-৫। এর দীর্ঘ পাল্লার কারণে সীমান্তবর্তী এলাকার পরিবর্তে দেশের অভ্যন্তরেও ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনের সুযোগ রয়েছে। এতে সম্ভাব্য শত্রুপক্ষের হামলা থেকে ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থা সুরক্ষিত রাখার পাশাপাশি পাল্টা আঘাতের সক্ষমতা বজায় রাখা সহজ হতে পারে।
অগ্নি-৫ ক্ষেপণাস্ত্রে একাধিক স্বতন্ত্র লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম এমআইআরভি প্রযুক্তির সক্ষমতাও প্রদর্শন করেছে ভারত। এ প্রযুক্তির মাধ্যমে একটি ক্ষেপণাস্ত্র থেকে একাধিক ওয়ারহেড পৃথকভাবে বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুর দিকে পাঠানো সম্ভব। ফলে একটি ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে একাধিক স্থানে আঘাত হানার সক্ষমতা তৈরি হয়, যা ভারতের কৌশলগত পারমাণবিক প্রতিরোধব্যবস্থাকে আরও জটিল ও শক্তিশালী করে তুলতে পারে।
ভারতের পারমাণবিক সক্ষমতার তৃতীয় ও গুরুত্বপূর্ণ স্তর হচ্ছে সমুদ্রভিত্তিক ব্যবস্থা। বিএএসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের এপ্রিলে ভারতের তৃতীয় পারমাণবিক শক্তিচালিত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রবাহী সাবমেরিন আইএনএস অরিধামান নৌবহরে যুক্ত হয়েছে। এর আগে আইএনএস অরিহন্ত ও আইএনএস অরিঘাতকে বহরে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এ ছাড়া আরও কয়েকটি সাবমেরিন নির্মাণাধীন রয়েছে। একই সঙ্গে কে-৪-এর মতো দীর্ঘপাল্লার সাবমেরিন থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনের দিকেও এগোচ্ছে ভারত।
পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন দীর্ঘ সময় সমুদ্রের গভীরে গোপনে অবস্থান করতে পারে। ফলে কোনো সম্ভাব্য প্রথম হামলায় ভারতের স্থল ও আকাশভিত্তিক পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হলেও সমুদ্রের গভীরে থাকা সাবমেরিন থেকে পাল্টা আঘাত হানার সক্ষমতা বজায় থাকতে পারে। এ কারণে পারমাণবিক প্রতিরোধব্যবস্থায় সাবমেরিনকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করা হয়।
তবে ভারতের পারমাণবিক অস্ত্রের প্রকৃত সংখ্যা, মোতায়েনের ধরন এবং বিভিন্ন অস্ত্রের কার্যকর পাল্লা সম্পর্কে দেশটির সরকার প্রকাশ্যে বিস্তারিত তথ্য দেয় না। ফলে স্বাধীন গবেষকদের এসব হিসাব মূলত উন্মুক্ত তথ্য, প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ ও বিভিন্ন প্রতিরক্ষা পর্যবেক্ষণের ওপর নির্ভরশীল। এ কারণে ১৯০টি ওয়ারহেডের হিসাবটিকেও আনুমানিক হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
বিএএসের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, ভারত একদিকে প্রথমে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার না করার নীতি বজায় রাখার কথা বলছে, অন্যদিকে সম্ভাব্য পারমাণবিক হামলার জবাবে নিশ্চিত ও কার্যকর পাল্টা আঘাত হানার সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। যুদ্ধবিমান, স্থলভিত্তিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং সাবমেরিনের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই ত্রিমাত্রিক কাঠামো ভারতের পারমাণবিক প্রতিরোধব্যবস্থাকে আরও বিস্তৃত ও স্থিতিশীল করার কৌশলের অংশ।
সব মিলিয়ে ভারতের পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডারের প্রকৃত আকার সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য না থাকলেও দেশটির অস্ত্র বহনব্যবস্থার আধুনিকায়ন, ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা বৃদ্ধি এবং সমুদ্রভিত্তিক সক্ষমতা সম্প্রসারণের বিষয়টি স্পষ্ট। বিশেষ করে পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন ও দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের উন্নয়ন ভারতের নিশ্চিত পাল্টা আঘাতের সক্ষমতাকে আরও জোরালো করার প্রচেষ্টারই প্রতিফলন।
BANGLA TODAY আজকের বাংলা