বিশেষ প্রতিনিধি-বাংলা টুডে
থানা-ফাঁড়ি থেকে লুট হওয়া অস্ত্রের কিছু চলে গেছে অপরাধীদের হাতে; জুলাইয়ের গুলিবর্ষণের ঘটনায় শনাক্ত ৪৬ জনের ২১ জন গ্রেপ্তার
চট্টগ্রামে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থানা ও পুলিশের বিভিন্ন স্থাপনা থেকে লুট হওয়া ৯৪৪টি আগ্নেয়াস্ত্রের মধ্যে ১৪৮টির এখনো হদিস মেলেনি। পুলিশের দাবি, এসব অস্ত্রের কিছু হাতবদল হয়ে অপরাধীদের কাছে পৌঁছেছে। এরই মধ্যে লুট হওয়া অস্ত্র ব্যবহার করে ছিনতাই, ডাকাতিসহ বিভিন্ন অপরাধের ঘটনাও ঘটছে।
অন্যদিকে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় চট্টগ্রাম নগরের বিভিন্ন এলাকায় প্রকাশ্যে অস্ত্র হাতে আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালানো ৪৬ জনকে শনাক্ত করেছিল পুলিশ। তাঁদের মধ্যে ২১ জন গ্রেপ্তার হলেও এখনো ২৫ জন ধরাছোঁয়ার বাইরে। পলাতক এসব অস্ত্রধারীর বেশ কয়েকজনের রাজনৈতিক পরিচয় যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত।
পুলিশ ও আদালত সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ১৬ ও ১৮ জুলাই এবং ৪ আগস্ট চট্টগ্রাম নগরের মুরাদপুর, বহদ্দারহাট, নিউমার্কেটসহ বিভিন্ন এলাকায় আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতার সঙ্গে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মী এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংঘর্ষ হয়। এসব ঘটনায় প্রকাশ্যে পিস্তল, শটগান ও কাটা বন্দুক নিয়ে গুলি চালানোর একাধিক ভিডিও ও ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
ভিডিও ফুটেজ ও ছবি বিশ্লেষণ করে এসব অস্ত্রধারীকে শনাক্ত করে পুলিশ। তাঁদের মধ্যে অনেকে বিভিন্ন পর্যায়ের যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও ছাত্রলীগের নেতা-কর্মী বলে পুলিশের নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
মুরাদপুরে প্রকাশ্যে অস্ত্র, গ্রেপ্তার মাত্র কয়েকজন
১৬ জুলাই মুরাদপুর এলাকায় পিস্তল হাতে দেখা যায় যুবলীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সাবেক উপ-অর্থ সম্পাদক হেলাল আকবর চৌধুরী বাবরকে। তিনি সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরীর অনুসারী হিসেবে পরিচিত।
একই এলাকায় কাটা বন্দুক হাতে দেখা যায় যুবলীগ নেতা পরিচয় দেওয়া মো. ফিরোজকে। নগর আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দীনের অনুসারী হিসেবে পরিচিত ফিরোজকে ২০২৪ সালের ২৪ অক্টোবর গ্রেপ্তার করে র্যাব।
শটগান হাতে নগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সংগঠক মো. দেলোয়ার এবং পিস্তল হাতে যুবলীগের কর্মী এন এইচ মিঠু ও মো. জাফরকেও দেখা যায়। মিঠু ও জাফর নগর ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নুরুল আজিমের অনুসারী হিসেবে পরিচিত।
মুরাদপুরে গুলিবর্ষণের ঘটনায় আহনাফ নামের এক ছাত্রলীগকর্মী ও চকবাজার ওয়ার্ড স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি মিঠুন চক্রবর্তীকে গ্রেপ্তার করা হয়। তবে ঘটনার সময় তাঁদের হাতে দেখা যাওয়া পিস্তল উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, শনাক্ত অস্ত্রধারীদের মধ্যে এখনো বেশ কয়েকজন প্রকাশ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয়। তাঁদের মধ্যে হেলাল আকবর চৌধুরী বাবরসহ কয়েকজনকে এখনো গ্রেপ্তার করা যায়নি।
বহদ্দারহাটে একাই ২৮ গুলি
১৮ জুলাই চান্দগাঁও থানার বহদ্দারহাট এলাকায় পিস্তল হাতে দেখা যায় চান্দগাঁও থানা স্বেচ্ছাসেবক লীগের বিলুপ্ত কমিটির সভাপতি মহিউদ্দিন ফরহাদ, যুবলীগের কর্মী মো. জালাল ওরফে ড্রিল জালাল, মো. জামাল, ঋভু মজুমদার ও মো. মিজানকে। সেখানে শটগান হাতে ছিলেন যুবলীগের কর্মী মো. তৌহিদুল।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, অস্ত্রধারীরা নগরের ৪ নম্বর চান্দগাঁও ওয়ার্ডের তৎকালীন আওয়ামী লীগ কাউন্সিলর মো. এসরালের অনুসারী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে তৌহিদুল, মিজান, জামাল ও ঋভু মজুমদারকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
পুলিশের ভাষ্য, পাকিস্তানি ওয়ান শুটারগান হাতে তৌহিদুল একাই আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতার দিকে ২৮টি গুলি ছুড়েছিলেন।

৪ আগস্টও দেখা যায় শটগানধারী
৪ আগস্ট বিকেল সোয়া তিনটার দিকে নগরের আসকার দিঘির পাড় এলাকায় আন্দোলনকারীদের ধাওয়া দেওয়ার সময় সাবেক কাউন্সিলর শৈবাল দাশের পাশে এক যুবককে শটগান হাতে দেখা যায়। তাঁর পরিচয় ফরহাদুল ইসলাম চৌধুরী ওরফে রিন্টু। তিনি ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সাবেক উপ-সমাজসেবাবিষয়ক সম্পাদক।
পুলিশের শনাক্ত করা অস্ত্রধারীদের মধ্যে এখনো তাঁর নামও রয়েছে।
দুই বছরে ১৫১ মামলার তদন্ত শেষ মাত্র ১৫টির
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে হতাহতের ঘটনায় চট্টগ্রামে ১৫১টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে নগর ও জেলার নয়টি থানায় দায়ের হয়েছে ৬৯টি মামলা। বাকি ৮২টি আদালতে দায়ের করা নালিশি মামলা।
এসব মামলায় নাম উল্লেখ করে আসামি করা হয়েছে ১৩ হাজার ৪৫০ জনকে। অজ্ঞাতনামা আসামি রয়েছেন অন্তত ৩০ হাজার। আসামিদের মধ্যে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের পাশাপাশি ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন পেশার মানুষও রয়েছেন।
তবে প্রায় দুই বছরেও এসব মামলার তদন্তে তেমন অগ্রগতি নেই। এ পর্যন্ত মাত্র ১৫টি মামলার তদন্ত শেষ হয়েছে। এর মধ্যে ১২টি মামলায় অভিযোগপত্র এবং তিনটি মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। অভিযোগপত্র দেওয়া ১২ মামলার মধ্যে একটি হত্যা মামলা।
থানা থেকে লুট ৯৪৪ অস্ত্র, এখনো উদ্ধার হয়নি ১৪৮
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট নগরের আট থানাসহ পুলিশের ২৯টি স্থাপনায় হামলা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। ওই সময় ৯৪৪টি আগ্নেয়াস্ত্র এবং ৮৬ হাজার ৪৭৮ রাউন্ড গুলি লুট হয়।
পুলিশের হিসাবে, গত দুই বছরে ৭৯৬টি অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার করা হয়েছে ৫৬ হাজার ৮৫৬ রাউন্ড গোলাবারুদ। এখনো উদ্ধার হয়নি ১৪৮টি আগ্নেয়াস্ত্র এবং বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ।
উদ্ধার হওয়া অস্ত্রের কয়েকটি সাম্প্রতিক অপরাধের ঘটনায়ও পাওয়া গেছে। গত ২৫ জুলাই নগরের খুলশীর আমবাগান এলাকায় মাদক ব্যবসায়ী ও সন্ত্রাসী মো. আলমগীরকে গ্রেপ্তারে অভিযান চালানোর সময় পুলিশের ওপর হামলা হয়। এতে তিন পুলিশ সদস্য আহত হন। পরে সেখান থেকে দুটি পিস্তল উদ্ধার করা হয়। পুলিশ জানায়, পিস্তল দুটি ডবলমুরিং থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র।
চলতি বছরের ১৬ জুন নগরের কোতোয়ালি থানা থেকে লুট হওয়া পুলিশের একটি পিস্তল ও গুলি এক কাভার্ডভ্যানচালকের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়।
এর আগে ২০২৫ সালের ১৮ জুন পাহাড়তলী থানা থেকে লুট হওয়া ৭ দশমিক ৬২ এমএম একটি পিস্তল পেশাদার ছিনতাইকারী সাইদুর রহমান মাসুম ওরফে ব্লেড মাসুমের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়।
‘লুটের অস্ত্র হাতবদল হয়ে অপরাধীদের কাছে গেছে’
নগর পুলিশের সহকারী কমিশনার (গণমাধ্যম) আমিনুর রশিদ বলেন, প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শন ও গুলিবর্ষণের ঘটনায় শনাক্ত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ইতিমধ্যে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্রের বিষয়ে তিনি বলেন, লুট হওয়া অধিকাংশ অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। কিছু অস্ত্র হাতবদল হয়ে সন্ত্রাসী ও অপরাধীদের হাতে গেছে। আবার কিছু অস্ত্র পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্ধার হয়েছে। বাকি অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান চলছে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রামের সাধারণ সম্পাদক আখতার কবির চৌধুরী বলেন, প্রকাশ্যে অস্ত্রধারীদের গ্রেপ্তার না করা এবং থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধার না হওয়ায় অপরাধ বাড়ছে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্কও বাড়ছে।
চট্টগ্রামে একদিকে থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্রের ১৪৮টির হদিস নেই, অন্যদিকে আন্দোলনকারীদের ওপর প্রকাশ্যে গুলি চালানো শনাক্ত ২৫ অস্ত্রধারী এখনো পলাতক। ফলে নগরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।






